ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

মেঘনার চরে কাশফুলের ঢেউ

মেঘনার চরে কাশফুলের ঢেউ
×
×

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনার চরে কাশবন

হাসান মাহমুদ রিপন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসছে। নিচে মেঘনার চরজুড়ে আরেক রকম সাদা। বাতাস এলেই হাজার হাজার কাশফুল একসঙ্গে মাথা দোলায়। দূর থেকে মনে হয়, আকাশের মেঘ বুঝি নেমে এসেছে বালুর ওপর।

শরৎ এমনই। এই কাঠফাটা রোদ, খানিক বাদেই ঝুমবৃষ্টি। ভ্যাপসা গরমে গা চটচট করে, তারপর হঠাৎ এক পশলা হাওয়া। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় প্রকৃতি। তবু পঞ্জিকা না দেখেও শরৎ চেনা যায় একটি ফুলে। নদীর ধারে, চরের বালুতে কাশ ফুটলেই বোঝা যায় ভাদ্র-আশ্বিন এসে গেছে। বর্ষার কদম ঝরে যাওয়ার পর এই সাদা ফুলই জানিয়ে দেয়–সামনে হেমন্ত, তারপর শীত।

রবীন্দ্রনাথ ছোটদের জন্য লিখেছিলেন, ‘চিক্‌ চিক্‌ করে বালি, কোথা নাই কাদা, / একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।’ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনার চরে দাঁড়ালে লাইন দুটো আর কবিতা থাকে না। চোখের সামনের ছবি হয়ে যায়।

ভাটিবন্দর থেকে কান্দারগাঁও
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়ন। ভাটিবন্দর আর কান্দারগাঁওয়ের মাঝখানে মেঘনার তীরে প্রায় ২০০ একর চরজুড়ে এখন কাশের রাজত্ব। নদীর ধার ধরে ভেতরে যত এগোনো যায়, কাশ তত ঘন হয়। দুই পাশের ফুলের সারি পথের দিকে নুয়ে থাকে। শেষ মাথায় পৌঁছালে যত দূর চোখ যায়, শুধু সাদা। আরেকটু দূরে মেঘনার ঢেউ তীরে এসে ভাঙে।

এই দৃশ্য দেখতে রোজ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসছে। কেউ আসেন সড়কপথে, কেউ দল বেঁধে নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করে নদীপথে। দুপুরের রোদ পড়তেই ভিড় বাড়ে। বিকেলের আলো তেরছা হয়ে কাশের ওপর পড়লে ফুলগুলো রুপালি দেখায়। সূর্য ডোবার সময় মেঘনার জলে গোধূলির লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। তাই বেশির ভাগ দর্শনার্থী আসেন শেষ বিকেলে। শুক্র ও শনিবার ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি।

এই পূর্ণ রূপ বেশি দিন থাকে না। ভাদ্রের শেষ দিকে ডাঁটার মাথায় ফুল আসতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চর থাকে সবচেয়ে সাদা। তারপর রোয়া ঝরে যায়, ডাঁটা শুকিয়ে বাদামি হয়। যারা দেখতে চান, তাদের হাতে তাই সময় অল্প।

কাশের ভেতরে চলছে ছবি তোলার ধুম। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। তরুণ-তরুণীরা ফুলের গুচ্ছ হাতে দাঁড়াচ্ছেন ক্যামেরার সামনে। কয়েক বছর আগেও কাশফুল নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। শরৎ আসত, কাশ ফুটত, নদীতীরের মানুষ দেখত। ফেসবুকের যুগে সেই চেনা ফুলই এখন মৌসুমের বড় আকর্ষণ। শরতে কাশবনে একটা ছবি না তুললে যেন মৌসুমটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে ছবির ফ্রেমে একটা জিনিস ধরা পড়ে না; সেটি বাতাসের শব্দ। কাশের ভেতর দিয়ে হাওয়া বয়ে গেলে একটানা সরসর আওয়াজ ওঠে; অনেকটা দূরের বৃষ্টির মতো। সেই শব্দ শুনতে হলে ফোনটা পকেটে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়াতে হয়।

অপু-দুর্গার কাশবন
কাশবনের কথা উঠলে অনেকের মনে পড়ে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’। সাদা কাশের ভেতর দিয়ে ছুটছে অপু আর দুর্গা, দূরে ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে রেলগাড়ি। সত্যজিৎ নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন, প্রথম দফায় দৃশ্যটির অর্ধেক তোলা হয়েছিল। সপ্তাহখানেক পর ফিরে এসে দেখেন, গরুর পাল মাঠের কাশ খেয়ে সাফ করে দিয়েছে। বাকি অংশ তুলতে তাঁকে পরের শরৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কাশের সৌন্দর্য এমনই ক্ষণস্থায়ী। বছরে কয়েক সপ্তাহ, তারপর আবার এক বছরের অপেক্ষা।

দর্শনার্থীর কথা
শিশুকন্যাকে নিয়ে এসেছেন আশিক ও শাপলা দম্পতি। কাশবনে দাঁড়িয়ে তাদের মনে পড়ছে ছাত্রজীবন। ‘বন্ধুরা মিলে কাশফুল ছিঁড়ে ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতাম। আকাশের সাদা-নীলের সঙ্গে ফুলের রোয়া মিশে যেত। আজ মেয়েটা সেই আনন্দ পাচ্ছে, এটাই বড় পাওয়া’– বললেন আশিক।

নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর ডন চেম্বার থেকে দুই মেয়ের আবদারে এসেছেন মনসুর আহম্মেদ। হেসে বললেন, ‘নদী আর তার পাশে কাশফুল, সত্যিই অসাধারণ। মনটা ভরে গেল। এবার বউকে বাসায় রেখে এসেছি। সামনে শুধু ওকে নিয়েই আসব।’

চাষাঢ়া থেকে এসেছেন মিতুল ও তাঁর বন্ধু আরজু। ছবি আর ভিডিওতে কাশবন তারা অনেক দেখেছেন। সামনে দাঁড়িয়ে দেখার অনুভূতি আলাদা। চারদিকে সাদা ফুল, সামনে নদী, মাথার ওপর খোলা আকাশ।

ঢাকার শনির আখড়া থেকে সপরিবারে এসেছেন রাতুল আহমেদ রিতু। তিনি বলেন, ‘শহরের ব্যস্তজীবনে এমন খোলা জায়গা পাওয়া যায় না। পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য জায়গাটা চমৎকার।’

চরের ঘাস, চরের জীবিকা
কাশ আসলে এক ধরনের লম্বা ঘাস, আখের জ্ঞাতি। নদীতে নতুন চর জাগলে অন্য গাছের আগে কাশই সেখানে শিকড় গাড়ে। মাটির গভীরে ছড়ানো শিকড় আলগা বালু আঁকড়ে ধরে। তাতে চর শক্ত হয়, পলি জমে, একসময় সেখানে চাষের মাটি তৈরি হয়। 

চরের মানুষের কাছে কাশ কেবল দেখার ফুল নয়। শুকনো কাশ দিয়ে গ্রামে ঘরের চাল ছাওয়া হয়, বেড়া বাঁধা হয়, ঝাঁটা বানানো হয়, চুলার জ্বালানিও হয়। ফুল ঝরে গেলে দেশের অনেক চরে শুরু হয় কাশ কাটার পালা। কাস্তে হাতে মানুষ নামে, আঁটি বেঁধে মাথায় বা নৌকায় তোলে। যে মাঠে আজ ক্যামেরার ঝলক, কদিন পর সেখানে ঘাম ঝরে খেটে খাওয়া মানুষের। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পর্যটনের আয়। স্থানীয় বাসিন্দা সালাউদ্দিন মধু জানান, ফুল ফোটার পর মাসখানেক এলাকাটা জমজমাট থাকে।

দর্শনার্থীদের ঘিরে জায়গায় জায়গায় বসেছে খাবারের দোকান। কেউ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। স্বল্প আয়ের মানুষের হাতে মৌসুমি আয়ের একটা পথ খুলেছে।

সৌন্দর্য বাঁচাবে কে
ভিড় বাড়লে শঙ্কাও বাড়ে। কাশবনের ভেতরে পড়ে থাকছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন আর খাবারের প্যাকেট। ছবি তোলার জন্য অনেকে কাশগাছ ভেঙে মাড়িয়ে যান। স্থানীয়রা তাই অনুরোধ করছেন, কেউ যেন কাশবনে আবর্জনা না ফেলেন, অকারণে গাছ নষ্ট না করেন।

আরেকটি শঙ্কাও আছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, এই মাঠের বড় একটি অংশ কারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনা। মাটি ভরাট করে দালান উঠলে এ কাশবন আর থাকবে না।

কবি রহমান মুজিব মনে করেন, ভাটিবন্দরের চর এরই মধ্যে মৌসুমি পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নৌযান, নিরাপত্তা আর পর্যটন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধান থাকলে মেঘনার এই তীর হতে পারে ব্যতিক্রমী এক বিনোদনকেন্দ্র।

আরও পড়ুন

×