ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ঘামের ডলার, আগামীর পুঁজি

ঘামের ডলার, আগামীর পুঁজি
×
×

অধ্যাপক নাজিম উদ্দিন

নাজিম উদ্দিন

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাসের শুরুতে গ্রামের কোনো এক মায়ের ফোনে একটা বার্তা আসে। রিয়াদ কিংবা দুবাই থেকে ছেলে টাকা পাঠিয়েছে। সে টাকায় চাল কেনা হয়, ছোট বোনের স্কুলের বেতন দেওয়া হয়, বাবার ওষুধ আসে, টিনের চালের জায়গায় একদিন ছাদ ওঠে। বাংলাদেশের কোটি পরিবারের কাছে প্রবাসী আয় এমনই এক ভরসার নাম।

তারপর? মাস ফুরোলে টাকাও ফুরোয়। মরুর রোদে পোড়া সেই ঘামের দাম সংসারের খরচেই শেষ হয়ে যায়। দেশের কোনো কারখানার যন্ত্র তাতে ঘোরে না, নতুন কারও চাকরি হয় না। প্রশ্নটা এখানেই। প্রবাসীর ডলার কি শুধু সংসার চালাবে, নাকি দেশও গড়বে?

বৈদেশিক মুদ্রার কথা আমাদের মনে পড়ে বিপদের দিনে। রিজার্ভ কমলে আমদানিতে লাগাম পড়ে। ডলারের দাম চড়লে বাজারে তদারকি বাড়ে। রেমিট্যান্স কমলে আসে প্রণোদনা। জ্বর এলে প্যারাসিটামল খাওয়ার মতো ব্যাপার। রোগটা সারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি পলিসি পেপার (পিপি নং ২৬০১) সে রোগের দিকেই আঙুল তুলেছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নিয়ে লেখা ওই বিশ্লেষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা লম্বা হলে আমাদের বিপদ আসবে দুদিক থেকে। জ্বালানি, জাহাজ ভাড়া, বীমা আর শিল্পের কাঁচামালের খরচ বাড়বে। আবার ওই অঞ্চলে কাজ করেন আমাদের লাখ লাখ মানুষ। তাদের চাকরি আর পাঠানো টাকা দুটোই পড়বে অনিশ্চয়তায়। 

তাই জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, সবখানে বৈচিত্র্য চাই। চাই অন্য রকম পুঁজি। বিদেশি ঋণে সেতু হয়, রাস্তা হয় কিন্তু সে ঋণ সুদসহ ফেরত দিতে হয়। আমাদের দরকার এমন টাকা, যা ব্যবসার ঝুঁকি ভাগ করে নেবে, প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাবে, মানুষের হাতে কাজ দেবে।

সেই টাকা আছে প্রবাসীদের কাছেই। প্রবাসী মানে এখন আর শুধু নির্মাণশ্রমিক বা গৃহকর্মী নন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, দুবাই, রিয়াদ, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুরে অনেক বাংলাদেশি আজ বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, অংশীদার, ব্যবস্থাপক, পেশাজীবী। তারা ব্যবসা চালাতে জানেন। আন্তর্জাতিক বাজার চেনেন। প্রযুক্তি আর সরবরাহব্যবস্থা বোঝেন। তাদের অনেকেই চান দেশে কিছু একটা গড়তে।

চাওয়া আর করতে পারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের পর টেবিল। অনেক প্রবাসী উদ্যোক্তার অভিযোগ, বিদেশে নিজের প্রতিষ্ঠানের বৈধ আয় দেশের একটি ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবে আনতে গেলেই ভোগান্তির শুরু। কাগজের স্তূপ জমে। নির্দেশনা অস্পষ্ট, অপেক্ষার শেষ কবে কেউ বলতে পারে না। মানুষটির সময় যায়, তার চেয়ে বেশি যায় আস্থা।

টাকার উৎস যাচাই হবে, পরিচয় নিশ্চিত হবে, কর ও নিয়ম মানতে হবে। এ নিয়ে কারও আপত্তি নেই। আপত্তি অন্য জায়গায়। বৈধ টাকাকে অনুমতির গোলকধাঁধায় ঘোরানো কোনো আধুনিক অর্থনীতির কাজ হতে পারে না।

প্রতিবেশীরা কাজটা করে দেখিয়েছে। পাকিস্তানের রোশন ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে প্রবাসীরা বিদেশে বসেই হিসাব খোলেন। সেখান থেকে সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাংক আমানত আর আবাসনে টাকা খাটান। মুনাফা বা মূলধন ফেরত নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগাম অনুমোদন লাগে না। ফল হাতেনাতে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এমন হিসাব খোলা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৬৬ হাজার। এসেছে ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

ভারত হেঁটেছে আরও আগে। এনআরই ও এফসিএনআর (বি) হিসাব, ব্যবসায়িক লেনদেনের আলাদা পথ, অর্থ ফেরতের অধিকার আর ডিজিটাল রিপোর্টিং দিয়ে তারা প্রবাসী অর্থকে সঞ্চয় ও মূলধনে বদলে নিয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আমানতে নিট প্রবাহ ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই ব্যক্তিগত রেমিট্যান্স এসেছে ৪২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।

আমাদের শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, আরএফসিডি ও এনএফসিডি হিসাব বিদেশে অর্জিত মুদ্রা দেশের ব্যাংকে ধরে রাখার পুরোনো ও কার্যকর ব্যবস্থা। এর পাশে আসতে পারে প্রবাসীদের জন্য ডলারভিত্তিক অবকাঠামো বন্ড, সবুজ জ্বালানি তহবিল, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডে সহজ বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অংশীদারিত্ব, স্বচ্ছ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল। গবেষণাপত্রে পুরোপুরি ডিজিটাল একটি ‘নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট’-এর প্রস্তাবও আছে। এখনও তা প্রস্তাবই। তবে টাকার সুরক্ষা আর ফেরত নেওয়ার স্পষ্ট অধিকার থাকলে এমন হিসাব প্রবাসীর ভরসা বাড়াবে।

লক্ষ্যটা কঠিন কিছু নয়। একজন যাচাই করা প্রবাসী দূরে বসেই হিসাব খুলবেন, কোম্পানি নিবন্ধন করবেন, বৈধ তহবিল পাঠাবেন, বিনিয়োগ কোথায় দাঁড়াল দেখবেন। ন্যায্য মুনাফা পাবেন, নিয়ম মেনে ফেরতও নিতে পারবেন।

সেদিন মায়ের ফোনের বার্তাটা আসবে আগের মতোই। সঙ্গে গ্রামের পাশে হয়তো একটা কারখানাও উঠবে, যেখানে কাজ পাবে পাড়ার আরও দশজন। বৈধ পুঁজির জন্য গতি, সব পুঁজির জন্য স্বচ্ছতা, অবৈধ পুঁজির বেলায় কঠোরতা–এই তিনের ওপর দাঁড়ালে রেমিট্যান্সের দেশ একদিন বিনিয়োগের দেশ হয়ে উঠবে। 

লেখক: নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থার অধ্যাপক, চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট ও উদ্যোক্তা

আরও পড়ুন

×