ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে পাবনার তাঁতশিল্প

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে পাবনার তাঁতশিল্প
×
×

প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর তাঁত কারখানায় ইতিবাচক কর্মপরিবেশ দেখা গেছে

 এ বি এম ফজলুর রহমান

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনা মানেই যেন তাঁতযন্ত্রের অবিরাম খটখট শব্দ। সুতার বুননে স্বপ্ন বোনার এক প্রাচীন আখ্যান এ জনপদের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। যুগের পর যুগ ধরে এ জেলার অসংখ্য মানুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে শুধু নিজেদের জীবিকাই নির্বাহ করছেন না, বরং বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার এক অমূল্য ঐতিহ্যকে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠের গল্পটা বেশ মলিন। দীর্ঘদিন ধরে মান্ধাতা আমলের উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে এ খাতের কারখানাগুলোয় পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব, ভ্যাপসা গরম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং জ্বালানির অপচয় এক নৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছিল। কারিগরদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বাড়ছিল উৎপাদন ব্যয়ও।

তবে আশার কথা হলো, শত বছরের পুরোনো এ খটখট শব্দে এবার যুক্ত হয়েছে সবুজের ছন্দ। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় বাস্তবায়িত ‘সাসটেইনেবল মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)’ প্রকল্পের মাধ্যমে খোলনলচে বদলে যাচ্ছে পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। মাঠ পর্যায়ে এই কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়ন করছে অন্যতম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘পাবনা প্রতিশ্রুতি’।

এ প্রকল্পের আওতায় পাবনা জেলার বিভিন্ন তাঁত ক্লাস্টারে প্রায় ৮০০ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। পাবনা সদর, আটঘরিয়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার জালালপুর, দোগাছী, একদন্ত, পুষ্পপাড়া, আতাইকুলাসহ বিভিন্ন তাঁতসমৃদ্ধ এলাকায় এখন পরিবর্তনের হাওয়া। একসময় যে কারখানাগুলোয় দিনের বেলায়ও ঘুটঘুটে অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরম থাকত, সেখানে এখন উঁকি দিচ্ছে সূর্যের আলো।

মূলত এ সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলতে স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ‘রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন (আরইসিপি)’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মূলমন্ত্র হলো–কম সম্পদ ব্যবহার করে অধিক দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা।

প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে অনেক উদ্যোক্তা এখন নিজ উদ্যোগে তাদের কারখানায় আধুনিক সব পদ্ধতি বাস্তবায়ন করছেন। কারখানায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘ন্যাচারাল ভেন্টিলেশন’। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক ফ্যান ও এলইডি লাইট স্থাপন, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করায় কারখানার অভ্যন্তরীণ চেহারা পাল্টে গেছে। বিদ্যুতের অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে এই আরইসিপি পদ্ধতি জাদুর মতো কাজ করছে।

পরিবর্তনের এই গল্প সমকালের কাছে তুলে ধরেন তাঁত উদ্যোক্তা মো. শাহিন আলী আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমরা কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নিই। ছাদ ও দেয়ালে পরিবর্তন এনে আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করেছি। এর ফলে আগের তুলনায় বিদ্যুৎ যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি কারখানার ভেতরের গুমোট গরমও অনেক কমেছে। কারিগররা এখন অনেক শান্তিতে কাজ করতে পারছেন, তাদের কাজেও গতি এসেছে।’

আরেক উদ্যোক্তা মো. সাদ্দাম হোসেনের কণ্ঠেও একই তৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের পুরো কর্মপরিবেশের উন্নতি হয়েছে। কারিগরদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে। দিন শেষে ভালো কর্মপরিবেশের ইতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে আমাদের মোট উৎপাদনের ওপর।’

শুধু পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিই নয়, তাঁত উদ্যোক্তাদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতেও কাজ করছে এই প্রকল্প। পাশাপাশি ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনা, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং আধুনিক বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ তৈরির বিষয়েও দেওয়া হচ্ছে নিবিড় প্রশিক্ষণ। ফলে উদ্যোক্তারা এখন আর শুধু স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকছেন না, বরং অনলাইনের বিশাল বাজারেও নিজেদের পণ্যের পসরা সাজাচ্ছেন।

‘পাবনা প্রতিশ্রুতি’র নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার খালেদ হাসান সমকালকে বলেন, ‘ঐতিহ্যকে অবিকৃত রেখে এ শিল্পকে আরও আধুনিক ও টেকসই করার কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাজ শুধু ঋণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং উদ্যোক্তাদের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁতশিল্পের উন্নয়ন মানে শুধু বেশি কাপড় বোনা নয়। উদ্যোক্তার ব্যবসার প্রসার, কারিগরের উন্নত কর্মপরিবেশ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন– সবকিছু এক সুতায় গাঁথলেই কেবল প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

আরও পড়ুন

×