পুনর্ভবায় প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান
পুনর্ভবা নদী থেকে মাহির ইয়াসিরের সংগ্রহ ও ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করা প্রাচীন নিদর্শন ছবি:: সাকিল হক
সাকিল হক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষা শেষে পুনর্ভবার পানি নামে। ভাঙা তীরের গায়ে তখন বেরিয়ে থাকে মাটির হাঁড়ির কানা, পোড়ামাটির টুকরা, কখনও কালচে হয়ে যাওয়া একটা ধাতব চাকতি। গ্রামের মানুষ এসব মাড়িয়ে ঘাটে যায়। এক কিশোর যেত না। সে উবু হয়ে বসত, কাদা থেকে জিনিসটা তুলে নিত, জামার খুঁটে মুছে দেখত। সেই কিশোরের নাম মাহির ইয়াসির। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে।
নদীর ঢেউ তীরের মাটি সরালে যা বেরিয়ে আসত, তার প্রতিটি ঘিরে মনে প্রশ্ন জাগত। জিনিসটা কার? কত দিনের?
২০২৪ সালের ১১ মে বিকেল। ঢাকার নিমতলীতে এশিয়াটিক সোসাইটির মিলনায়তনে আলোচনার বিষয় ‘রহনপুর: বরেন্দ্রভূমির প্রবেশদ্বার’। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একদল শিক্ষক দেড় বছর অনুসন্ধানের পর জানালেন, পুনর্ভবা ও মহানন্দাতীরের এ জনপদে প্রাচীনকালে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র ও বসতি ছিল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ সোহরাব উদ্দীন। সোসাইটির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ সেদিন মঞ্চ থেকে তিনি দর্শকসারিতে একটি ছেলেকে খুঁজছিলেন।
কারণটা সোজা। যে মুদ্রা, পুঁতি, সিল আর মৃৎপাত্র পরীক্ষা করে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তার বেশির ভাগই মাহিরের ঘর থেকে পাওয়া। দুই শতাধিক নিদর্শন তিনি নিজে বয়ে এনেছিলেন ঢাকায়। মিলনায়তনের সামনে সাজানো ছিল ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা, ছাঁচে ঢালা তামার মুদ্রা, পাথরের পুঁতি, মৃৎপাত্র, মাটি ও পাথরের মূর্তি, নানা মাপের পাথরের বাটখারা। মাহির জানান, এ তাঁর সংগ্রহের সামান্য অংশ। ২২ বছর বয়সী মাহির ইয়াসির বর্তমানে রাজশাহী বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ছাত্র।
কুড়ানো জিনিস কী বলে
আলাদা করে দেখলে এগুলো পুরোনো আমলের টুকিটাকি। একসঙ্গে রাখলে একটা শহরের চেহারা ফোটে। ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো মুদ্রার একটি, খ্রিষ্টের জন্মের কয়েকশ বছর আগে থেকে এর চল। বাটখারা থাকা মানে মাপজোখ ছিল। মাপজোখ মানে হাট ছিল। গবেষকরা ব্রাহ্মী হরফ খোদাই করা পোড়ামাটির সিল আর কালো চকচকে এক ধরনের মৃৎপাত্রের কথাও জানিয়েছেন। এই মৃৎপাত্র মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বরেও মিলেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা একে আদি নগরায়ণের চিহ্ন হিসেবে পড়েন।
ভূমির গড়ন দেখে গবেষকরা পরিকল্পিত জলাধার, পানিব্যবস্থাপনা আর কেন্দ্রীয় শাসনের আভাসও পেয়েছেন। তাদের মতে, পূর্ব ও মধ্য ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের একটি কেন্দ্র ছিল রহনপুর। বরেন্দ্রের উঁচু লাল মাটিতে ঢোকার মুখে, দুই নদীর ঘাটে, নৌকায় পণ্য ওঠানামা করত।
রহনপুর আজও এক অর্থে প্রবেশদ্বার। এখানকার রেলস্টেশন হয়ে ভারতের সিঙ্গাবাদ থেকে পণ্যবাহী ট্রেন ঢোকে। আড়াই হাজার বছর আগে যে কাজ করত নদীর ঘাট, এখন তা করে রেললাইন। ভূগোল বদলায়নি, বদলেছে বাহন।
শুরু একটা সিন্দুক থেকে
মাহির তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন। তাঁর দাদার মা ছিলেন মালদহের আইহো জমিদারবাড়ির মেয়ে। ভোলাহাটের পাশে নদী পেরোলেই আইহো। সেই সূত্রে বাড়িতে ছিল একটা লোহার সিন্দুক। খুলে পাওয়া গেল ব্রিটিশ আমলের কিছু মুদ্রা। মাহির সেগুলো নিয়ে বসলেন। কোন চিহ্ন কোন আমলের, কোন মুদ্রা কোন সাম্রাজ্যের, বই ঘেঁটে শিখতে লাগলেন। ইতিহাসের বইয়ে পড়তেন গৌড়ের কথা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সেই প্রাচীন গৌড়েরই অংশ। নিজের জনপদকে বইয়ের পাতায় পেয়ে টানটা আরও বাড়ল।
‘অন্যরা পুরোনো মুদ্রা, ভাঙা হাঁড়ি বা মাটির নিচ থেকে ওঠা অচেনা জিনিসকে মূল্যহীন ভাবত। আমি তাতে ইতিহাসের গন্ধ পেতাম’–বললেন মাহির। মুদ্রার নেশা তাঁকে ঘর থেকে মাঠে নামাল। গ্রামের পর গ্রাম, কাঁচা রাস্তা, নদীর তীর, ঝোপজঙ্গল। কারও ঘরের পুরোনো বাক্স, কোথাও মাটির ঢিবি, যেখানে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা, সেখানেই গেছেন।
মাহির থামেননি। পোড়ামাটির পুতুল, রুপার মুদ্রা, সিল, পুঁতি, ঘরগেরস্তির তৈজস, পূজা-অর্চনার সামগ্রী, যা হাতে এসেছে তুলে রেখেছেন। শুধু জমাননি, পড়েছেনও। কোনটা কী, বয়স কত, কোথা থেকে এলো, জানার চেষ্টা করেছেন। ‘ঘুরতে ঘুরতে একসময় বুঝলাম, আমার চারপাশের মাটির নিচে বিচ্ছিন্ন কিছু পুরোনো জিনিস নেই। আছে একটা লম্বা ইতিহাস’–বললেন তিনি।
সেই খেলনাই পরে কথা বলল। রহনপুরে নওদা বুরুজ নামে একটি প্রাচীন ঢিবি আছে। জনশ্রুতি বলে, এটি রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদ। বখতিয়ার খলজির আক্রমণের খবরে তিনি এখান থেকে নদীপথে সরে যান। এই ঢিবি নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে মাহির টের পান, মাটির নিচের গল্পটা সেন আমলের চেয়ে ঢের পুরোনো। তাঁকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে পুঁতি। তাঁর ধারণা, এ অঞ্চলে একসময় রত্নপাথরের পুঁতি বানানোর কারিগর ছিল আর সেই পুঁতি দূরের হাটে বিক্রি হতো। তাঁর মতে, এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল পুনর্ভবা আর মহানন্দাকে ঘিরে। নিজের বাড়িতে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর ও গবেষণাগার।
খনন এখনও বাকি
তবে কাজ এখনও অর্ধেক বাকি। গবেষক দল নিজেই জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধান ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। কোথাও খনন হয়নি, পূর্ণাঙ্গ মানচিত্রও তৈরি হয়নি। মাটির স্তর ধরে খনন আর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বয়স নির্ণয় না হলে আড়াই হাজার বছরের হিসাবটা পোক্ত হবে না। কুড়িয়ে পাওয়া নিদর্শনের একটা সীমাও আছে। কোন স্তর থেকে, কিসের পাশ থেকে জিনিসটা উঠল, তা জানা না গেলে অর্ধেক তথ্য হারিয়ে যায়।
নওদা বুরুজের বেলায়ও তা-ই। ত্রয়োদশ শতকের ইতিহাসবিদ মিনহাজের বিবরণে লক্ষ্মণ সেনের সরে যাওয়ার জায়গাটির নাম ‘নওদিয়া’। ইতিহাসবিদরা সাধারণত একে নদীয়া বলে ধরেন। রহনপুরের ঢিবিটি আসলে কোন আমলের, কী কাজের, তার মীমাংসা জনশ্রুতিতে হবে না। হবে খননে।
এ কথা অনস্বীকার্য, মাহির না কুড়ালে এগুলো নদীতেই থেকে যেত। যে নদী মাটি সরিয়ে ইতিহাস দেখায়, পরের বর্ষায় সে-ই তা ভাসিয়ে নেয়। তাই সরকারি জরিপ, এলাকাটির সুরক্ষা আর মাহিরের সংগ্রহের বিজ্ঞানসম্মত নথিভুক্তি জরুরি।
- বিষয় :
- সাকিল হক
- প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
- ইতিহাস