নীল জিন্সের আড়ালে পানির হিসাব
ডেনিম উৎপাদনে পরিশোধিত বর্জ্যপানি আবার কাজে লাগালে বছরে প্রায় ছয় লাখ ১৯ হাজার ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি বাঁচতে পারে
অভিষেক দত্ত
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডেনিম বললে প্রথমে জিন্সের প্যান্টের কথাই মনে আসে। অথচ ব্যাগ, জুতা, কুশন কভার, টেবিল ম্যাট, এমনকি আসবাবেও এই কাপড়ের চল আছে। কেনার সময় আমরা রং দেখি, মাপ দেখি, দাম দেখি। দেখি না শুধু পানির ব্যবহার। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দিনে পান করেন দুই থেকে তিন লিটার পানি। একটি জিন্স শুধু কারখানার ধোয়া আর রাঙানোর ধাপেই টেনে নেয় শতাধিক লিটার। তুলার ক্ষেত থেকে হিসাব ধরলে অঙ্কটা কয়েক হাজার লিটারে গিয়ে ঠেকে।
ডেনিমের যাত্রা শুরু তুলার ক্ষেতে। বহুল প্রচলিত হিসাবে এক কেজি তুলা ফলাতে লাগে প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি, বৃষ্টি আর সেচ মিলিয়ে। একটি জিন্সের মোট পানির বড় অংশ তাই খরচ হয়ে যায় কারখানার ফটকে পৌঁছানোর আগেই। তবে একটি প্রচলিত ধারণা শুধরে নেওয়া দরকার। তুলা বিশ্বের আবাদি জমির আড়াই থেকে তিন শতাংশ জুড়ে আছে। কৃষির সেচের পানিতেও তার ভাগ মোটামুটি তিন শতাংশ। সংকটটা তাই মোট পরিমাণে যতটা, তার চেয়ে বেশি জায়গার প্রশ্নে। তুলার বড় অংশ ফলে এমন সব অঞ্চলে, যেখানে পানি এমনিতেই কম।
স্পিনিং মিলে তুলা থেকে সুতা কাটতে পানি তেমন লাগে না। লাগে রং ধরাতে। ডেনিমের চেনা নীল রং আসে ইন্ডিগো থেকে। এই রং এক চুবানিতে বসে না। সুতাকে রঙের দ্রবণে ডুবিয়ে বাতাসে মেলে ধরতে হয়, তারপর আবার ডোবাতে হয়। নীল যত গাঢ়, চুবানি তত বেশি। এরপর তাঁতে তোলার আগে সুতায় মাড় দেওয়া হয়, কারখানার ভাষায় সাইজিং। স্টার্চ, পিভিএ বা সিএমসির এই প্রলেপ তৈরি হয় চড়া তাপে, পানিতে জ্বাল দিয়ে। প্রলেপ থাকলে তাঁতের টানে সুতা সহজে ছিঁড়ে না।
সবচেয়ে বেশি পানি যায় শেষ ধাপে, ওয়াশিং আর ফিনিশিংয়ে। রং পাকা করতে আর বাড়তি কাঁচা রং ঝরাতে গরম ও ঠান্ডা পানিতে ১৪ থেকে ১৫ দফা ধোয়া চলে। পছন্দের শেড আর ‘লুক’ আনতে যোগ হয় আরও পাঁচ থেকে দশটি ভেজা ও শুকনো প্রক্রিয়া। প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি প্যান্ট ধুতে লাগে ৫০ থেকে ১৫০ লিটার পানি। ডাইং, স্কাউরিং ও ব্লিচিং ধরলে প্রতি কেজি কাপড়ে খরচ দাঁড়ায় ২৫০ থেকে ৩০০ লিটারে। একটি জিন্সের ওজন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম। অর্থাৎ শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণেই প্যান্টপ্রতি যায় ১২৫ থেকে ১৮০ লিটার।
বাংলাদেশে এ পানির প্রায় সবটাই ওঠে মাটির নিচ থেকে। আইএফসির প্যাক্ট কর্মসূচির হিসাবে দেশের কাপড় ধোয়া ও রাঙানোর কারখানাগুলো বছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করে। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পঘন এলাকায় পানির স্তর কোথাও কোথাও বছরে দুই থেকে তিন মিটার করে নামছে। কারখানার গভীর নলকূপ যত নিচে নামে, পাশের মহল্লার চাপকলে পানি ওঠা তত কঠিন হয়। ওই মহল্লাতেই থাকেন কারখানার শ্রমিকরা।
তাহলে পথ কী? বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) শিক্ষকদের কাছে প্রশ্নটা রাখা হয়েছিল। ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম জানান, প্রাকৃতিকভাবে রঙিন তন্তু ব্যবহার করলে স্কাউরিং, ব্লিচিং ও ডাইং বাদ দেওয়া যায়। তাতে পানি বাঁচে। তবে তিনি সতর্কও করেন। বিকল্প ওয়াশিং পদ্ধতিতে পানি কম লাগে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পানি লাগেই।
ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমানা শাহরিন তানিয়া বলেন, ‘অনবরত নতুন পানি না ঢেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ধরে রেখে ‘ব্লক ওয়াশ’ করলে খরচ কমে। কম লিকার রেশিওর আধুনিক ওয়াশিং মেশিন, ওজোন ওয়াশিং, লেজার ফিনিশিং ও ই-ফ্লো প্রযুক্তিতে প্রচলিত প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপই বাদ পড়ে। সাশ্রয় হয় পানি ও রাসায়নিক দুটোই।
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদ সরকার সাম্প্রতিক গবেষণার কথা তোলেন। পাল্টা-প্রবাহে ধোয়া, বর্জ্য পানির পুনর্ব্যবহার, কস্টিক পুনরুদ্ধার ও পানি পরিশোধন মিলিয়ে একটি ডেনিম কারখানার পানির ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। মানিকগঞ্জের একটি কারখানা নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, পরিশোধিত বর্জ্যপানি আবার কাজে লাগালে বছরে প্রায় ছয় লাখ ১৯ হাজার ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি বাঁচতে পারে। লিটারের হিসাবে প্রায় ৬২ কোটি। ২০২৬ সালের আরেক গবেষণা বলছে, ধোয়ার পানি ধাপে ধাপে ঘুরিয়ে ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে খরচ দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামানো যায়। কারখানার অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। এক দশক আগে এক কেজি ডেনিম ধুতে লাগত প্রায় ২০০ লিটার পানি। এখন অনেক কারখানায় লাগে ৫০ থেকে ৫৩ লিটার।
বাধা একটাই–খরচ। যন্ত্রের দাম চড়া, বসানোর ব্যয়ও কম নয়। তাই বদলটা ধীর। অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান চৌধুরীর মতে, পানি বাঁচালে উৎপাদন খরচ কতটা কমবে, তা নির্ভর করে কারখানার প্রযুক্তি, উৎপাদনের পরিমাণ, জ্বালানি ও রাসায়নিকের দাম এবং বর্তমান পানিব্যবস্থাপনার ওপর। শুরুতে বিনিয়োগ লাগে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা লাভজনক হতে পারে। কারণটা সহজ। পানি ঘুরিয়ে ব্যবহার করলে নলকূপের পাম্প কম চলে, ইটিপির ওপর চাপ কমে, পানি গরম করার জ্বালানিও বাঁচে। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যয়ে প্রায় ১০ শতাংশ সাশ্রয় হতে পারে।
বিদেশি ক্রেতারাও এখন সরবরাহকারীর কাছে পানির হিসাব চাইছেন। তবে হিসাবটা আগে আমাদের নিজেদের দরকার। জিন্স জাহাজে ওঠে, ডলার আসে। মাটির নিচ থেকে তোলা পানি কিন্তু আর ফেরে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)
- বিষয় :
- ডেনিম
- জিন্স
- পানি পরিশোধন
- বুটেক্স