ইতিহাস, ঐতিহ্য আর একান্ত আবেগের অনুরণন
পুরান ঢাকার দুর্গাপূজা
ছবি: এস বি কাব্য
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা শহরের হৃৎপিণ্ড যে অঞ্চলটি এবং যার নাম উচ্চারণ মাত্রই গায়ের রোম খাড়া হয়ে ওঠে, তা হলো পুরান ঢাকা। একটি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান ও শিল্পকলার এক নির্ভরযোগ্য জীবন্ত দলিল যেন পুরান ঢাকার গলি ও দালানগুলো। এই পুরান ঢাকায় প্রতি বছর শরতের কাশফুল ওড়া ভোরে ধূপের গন্ধে, শঙ্খের শব্দে আর অজস্র মানুষের করজোড়ে প্রার্থনায় উদযাপিত হয় দুর্গাপূজা। এই পূজা পুরান ঢাকায় শুধু ধর্মীয় রীতি নয়; বরং এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিত্রকল্প; যা ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের অন্তরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নবাবপুরসহ আশপাশের এলাকাগুলোয় শত বছর ধরে পূজা হয়ে আছে। হিন্দু ব্যবসায়ীরা যখন এ এলাকাগুলোয় বসবাস শুরু করেন, তখন থেকেই তারা নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে পরিবার ও পেশার সঙ্গে একত্র করেন। শাঁখারীবাজারে মূলত বসবাস করতেন শাঁখা প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতারা। যাদের ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াও পেশার মধ্য দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে ওঠে। এ পেশাজীবীরাই তাদের পল্লিতে গড়ে তোলেন ছোট ছোট মন্দির, গৃহমণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরির কারখানা; যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে বৃহৎ উৎসবে রূপ নিয়েছে।
পুরান ঢাকার দুর্গাপূজার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো–সব ধর্ম এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। পূজার বড় মণ্ডপের জন্য মাচা বাঁধা, রাস্তা ক’দিনের জন্য বন্ধ থাকা কিংবা চলাচলের অসুবিধা নিয়ে সেখানকার কোনো স্থানীয় মুসলিম বা অন্যদের আপত্তি দেখা যায় না। লক্ষ্মীবাজারে ঘুরতে ঘুরতে সত্তরোর্ধ্ব আহমদের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর কাছে পুরান ঢাকার দুর্গাপূজা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো প্রতিবছরের বিষয়। আমাদের কাছে তো এটা খুব স্বাভাবিক। সবাই নতুন জামা-কাপড় পরে নিজেদের ধর্ম মন দিয়ে পালন করছে, উৎসব করছে। দেখতে ভালোই লাগে।’
আহমদের মতো এরকম চিন্তার মেলবন্ধনের কারণে পুরান ঢাকার দুর্গাপূজা এখন এক অনন্য স্থান দখন করে আছে। মুসলমান ছেলেরা এসে মণ্ডপে শোভাযাত্রার কাজে সাহায্য করে, কখনও পূজার দিন আলোর ডেকোরেশন কিংবা প্রসাদের বণ্টনে অংশ নেয়। এটি যেন এক নিঃশব্দ ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ। এই সহাবস্থানের ঐতিহ্য বহু বছর ধরে এ এলাকায় বজায় রয়েছে।
প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয় আশ্বিন মাসের প্রথম থেকেই। প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় মাটি, খড়, পাট ও রং–সবকিছুই স্থানীয় কৌশলে তৈরি। কখনও পুরোনো কাঠামো পুনর্ব্যবহার করে প্রতিমা নির্মাণ করা হয় আবার অনেকে সবকিছু নতুন করে দেবী মাকে সাজিয়ে নিয়ে যান। তবে সবকিছুতেই ঐতিহ্যের ছোঁয়া বজায় থাকে।
এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন দোকানে শুরু হয় কেনাকাটা। শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজারে পূজার আনুষঙ্গিক জিনিস কেনাকাটা আবার চকবাজার, লক্ষ্মীবাজারে পরিবারের জন্য কেনাকাটা। এ ছাড়া তো চারপাশে ধূপের গন্ধের সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন ভোগের মিষ্টান্নের ঘ্রাণ। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজায় পুরান ঢাকায় পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় যত মানসিক অস্থিরতা।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চোখ ধাঁধানো আলো এবং ঘণ্টা-মন্ত্রের শব্দে বিমোহিত হতে হয়। কোনো ধর্মভেদ নেই। এখনও একবার হেঁটে বেড়ালে দেখা যায় কোনো কোনো বাড়ি কিংবা মণ্ডপে দুই থেকে তিন প্রজন্ম একসঙ্গে হয়ে দেবীর সামনে মাথা ঠোকেন।
পুরান ঢাকার দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আয়োজন নয়। এটি একইসঙ্গে এক জীবনের গল্প, যা আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। এখানে প্রতিমা গড়া মানে শুধু শিল্প নয়, তাহলো বেঁচে থাকার এক চিত্রকল্প। আরতির ধ্বনি, ঢাকের বাজনা, কুমারীর পদচিহ্ন, ভোগের মিষ্টান্ন–সব মিলিয়ে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। প্রতিটি মণ্ডপের আঁকিবুঁকি, ধূপের ধোঁয়া আর হাসিমুখের অন্তরালে লুকিয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস ও একান্ত অনুভব; যা ঢাকার নব্য আকাশচুম্বী ভবন আর কাচের শহরে খুঁজে পাওয়া যায় না। কালের গহ্বরে জৌলুস হারানোর পথে থাকা পুরান ঢাকার দুর্গাপূজা– তবুও প্রতি বছর যান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন আবহকে সজীব করে তোলে আর সমাজকে একত্র করে হৃদয়ের বাঁধনে।
মহালয়া থেকে দশমী; যেন সদা জাগ্রত থাকে বংশাল থেকে শুরু বুড়িগঙ্গা ঘাট পর্যন্ত। মহালয়ার ভোরে বংশালের অলিগলি থেকে ভেসে ওঠে চণ্ডীপাঠের সুর। নারিন্দার পূজামণ্ডপে মৃৎশিল্পী বিমল পাল বলেন, ‘আমরা সারাবছর অপেক্ষায় থাকি এ সময়টার জন্য। মাটির গন্ধ, দেবীমূর্তির চোখ আঁকার মুহূর্ত–এটাই আমাদের আনন্দ।’ মহালয়ার সকাল যেন এক অদৃশ্য ডাকে সবাইকে একত্র করে। ঢাকের আওয়াজ শুনে তারা ছুটে আসে প্রতিমা দেখার জন্য।
ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিটি মণ্ডপে যেন উৎসবের মেলা বসে। নারিন্দার পুরোনো কালী মন্দির, অর্থাৎ বর্তমান রমনা কালী মন্দিরে পূজা তদারকির কাজ দেখতে আসেন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সুধীর চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘আমাদের ছয় প্রজন্ম ধরে এখানে পূজা হয়। ছোটবেলায় আমরা মাটির প্রদীপ জ্বালাতাম, এখন সবই আলো-ঝলমলে। কিন্তু আনন্দটা একই আছে।’
অন্যদিকে চকবাজারের মুসলিম ব্যবসায়ী মো. আলমগীর প্রতিবছরই প্রতিমা দেখতে আসেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘এটা ওদের পূজা, তবে আনন্দটা আমাদেরও। ছেলেমেয়েদের নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে আসি। খাওয়া-দাওয়া করি। মন্দিরের পাশে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও হয়।’
দশমীর দিন বিকেলে বুড়িগঙ্গা ঘাট হয়ে ওঠে আবেগের মিলনস্থল। লালপাড়ের সাদা শাড়ি পরা নারীরা শঙ্খ বাজান, পুরুষরা ঢাক বাজান আর নদীর জলে প্রতিমা ভাসতে থাকে। তখন অনেকের চোখে জল। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যায় বিদায়ের সুর।
বংশাল থেকে বুড়িগঙ্গা ঘাট পর্যন্ত এই যাত্রা কেবল এক উৎসব নয়–এটি পুরান ঢাকার প্রাণের উচ্ছ্বাস, বর্ণিল সহাবস্থানের প্রতীক। এখানে প্রস্ফুটিত আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন।
- বিষয় :
- দ্রোহী তারা
- দুর্গাপূজা
- পুরান ঢাকা