পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়া চে গুয়েভারা, পুঁজিবাদেরই ব্র্যান্ড
একটি আলোকচিত্র কীভাবে রাজনীতি, প্রতিবাদ ও ফ্যাশনের জগতে হয়ে উঠল বিশ্বজনীন প্রতীক
ছবি: নিউজ ক্লিক
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:০৭ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:১৩
যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়েছিলেন, সেই ব্যবস্থার বাজারেই আজ তার মুখের জয়জয়কার। টি-শার্ট, ক্যাপ, ব্যাগ কিংবা পোস্টারে- বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত এক মুখ চে গুয়েভারা। কারও কাছে তিনি বিপ্লবের প্রতীক, কারও কাছে প্রতিবাদের ভাষা, আবার কারও কাছে নিছক ফ্যাশন। একজন বিপ্লবীর প্রতিকৃতি কীভাবে এমন বৈপরীত্যের মধ্যেও টিকে রইল?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে লন্ডনের ক্যামডেন মার্কেট, কিংবা নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়ক- চে’র প্রতিকৃতি ছড়িয়ে আছে পোশাক, পোস্টার, কফির মগ, ব্যাগ ও মোবাইল ফোনের কভারে। তার ছবি ব্যবহার করা মানেই যে সবাই তার রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, তা নয়। কেউ তাকে বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হিসেবে ধারণ করেন, কেউ পছন্দ করেন ছবিটির নান্দনিকতা, আবার কারও কাছে এটি তারুণ্যের বিদ্রোহী মানসিকতার প্রকাশ।
একজন বিপ্লবীর প্রতিকৃতি কীভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারের পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হলো? আর বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে টিকে আছে সেই ছবির প্রতিবাদী আবেদন?

একটি ছবি, বদলে যাওয়া পরিচয়
১৯৬০ সালের ৫ মার্চ। কিউবার রাজধানী হাভানার কোলন কবরস্থানে আগের দিন লা কুব্রে জাহাজে বিস্ফোরণে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণসভা চলছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে ৭৫ থেকে ১০০ জনের কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মঞ্চের এক পাশে এসে দাঁড়ালেন এক তরুণ বিপ্লবী। মাথায় কালো বেরেট টুপি, তাতে লাল তারকা; এলোমেলো চুল আর চোখে দৃঢ়, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দৃষ্টি।
তিনি চে গুয়েভারা। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কিউবান আলোকচিত্রী আলবার্তো কোর্দার লাইকা ক্যামেরায় বন্দী হলো সেই মুহূর্ত। ছবিটির নাম দেওয়া হয় গেরিলেরো হেরোইকো, যার অর্থ বীরত্বপূর্ণ গেরিলা।
সেই ছবিই পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে চে গুয়েভারার সবচেয়ে পরিচিত প্রতিকৃতিতে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ায় বন্দি হওয়ার পর ৩৯ বছর বয়সে তাকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পর ছবিটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। আইরিশ শিল্পী জিম ফিটজপ্যাট্রিক কোর্দার আলোকচিত্র অবলম্বনে তৈরি করেন লাল-কালো রঙের একটি গ্রাফিক প্রতিকৃতি। সহজে পুনর্মুদ্রণযোগ্য এই ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে।
১৯৬৮ সালে ইউরোপের ছাত্র আন্দোলন, প্যারিসের বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদে চে’র প্রতিকৃতি দেখা যেতে থাকে। তার মুখচ্ছবি হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থানের দৃশ্যমান চিহ্ন।
একসময় যে ছবি বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষের হাতে হাতে ঘুরেছে, সেটিই পরে জায়গা করে নেয় বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন ও বাণিজ্যিক পণ্যের জগতে। চে’র পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে এমন এক প্রতীক, যার অর্থ আর কোনো একটি রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
প্রতিবাদের প্রতীক থেকে বাণিজ্যিক পণ্য
চে গুয়েভারার প্রতিকৃতির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর দৃশ্যগত স্বাতন্ত্র্য। কালো-লাল রঙের বিন্যাস, বেরেট টুপির ওপর তারকা এবং দূরে তাকিয়ে থাকা মুখ- সব মিলিয়ে ছবিটি সহজেই চেনা যায়। গ্রাফিক নকশায় রূপান্তরিত হওয়ার কারণে ছবিটি পোস্টার থেকে শুরু করে পোশাকের ছাপচিত্র, নানা পণ্যে ব্যবহার করাও সহজ হয়েছে।
ফলে চে’র ছবি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সমাবেশ ও প্রতিবাদের মঞ্চ ছাড়িয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। টি-শার্ট, ক্যাপ, ব্যাগ, পোস্টার কিংবা মগে তার মুখচ্ছবি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একদিকে বিপ্লবী ইতিহাসের স্মৃতি ছড়িয়ে পড়ে, অন্যদিকে তৈরি হয় নতুন বাণিজ্যিক বাজার।
এই বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে প্রতীকের রাজনৈতিক অর্থের চেয়ে তার পরিচিতি ও দৃশ্যগত আবেদন অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। একজন ক্রেতা চে’র ছবি সংবলিত টি-শার্ট কিনতে পারেন তার বিপ্লবী আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে। আবার অন্য কেউ সেটি কিনতে পারেন কেবল নকশাটি পছন্দ হওয়ায়।
অর্থাৎ একই প্রতিকৃতি একেকজনের কাছে একেক রকম অর্থ বহন করছে। কারও কাছে তা শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, কারও কাছে তারুণ্যের পরিচয়, আবার কারও কাছে ফ্যাশনের একটি উপাদান।
এই বহুমাত্রিক ব্যবহারই চে’র ছবিকে বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে তার প্রতিকৃতির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা থেকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের আয় বা ব্র্যান্ডমূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। বরং বলা যায়, তার মুখচ্ছবি এমন একটি সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন।
ফ্যাশনের মঞ্চে বিপ্লবী চে
চে গুয়েভারার প্রভাব শুধু সাধারণ পোশাক বা স্মারকপণ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফ্যাশন ও বিনোদনজগতেও তার প্রতিকৃতির উপস্থিতি দেখা গেছে। ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার জঁ-পল গলতিয়ে তার নকশায় চে’র পরিচিত অবয়ব ও বেরেট টুপির অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। পপশিল্পী ম্যাডোনার আমেরিকান লাইফ অ্যালবামের প্রচ্ছদেও চে’র প্রতিকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ চিত্ররূপ দেখা যায়। মার্কিন রক ব্যান্ড রেজ এগেইনস্ট দ্য মেশিনের মতো শিল্পীদের পরিবেশনা ও প্রচারসামগ্রীতেও বিপ্লবী প্রতীকের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে।
এ ধরনের ব্যবহারে চে গুয়েভারার ছবি একদিকে বিপ্লবী ইতিহাসের স্মারক, অন্যদিকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচিত অনুষঙ্গ। ফ্যাশনের জগতে কোনো প্রতীক ব্যবহৃত হলে তা নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছায়। তবে সেই সঙ্গে প্রতীকটির মূল রাজনৈতিক বক্তব্য আড়াল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
যে ছবি একসময় সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ ও প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি যখন দামি পোশাক কিংবা বাণিজ্যিক পণ্যের নকশায় জায়গা করে নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- ছবিটি কি তার আগের রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরে রাখতে পারছে, নাকি কেবল পরিচিত একটি নকশায় পরিণত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। কারণ, প্রতীকের অর্থ কেবল তার নির্মাতা বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ব্যবহারকারী ও দর্শকের ব্যাখ্যাও তাতে ভূমিকা রাখে।

তরুণদের কাছে চে কেন আকর্ষণীয়
নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা আজাদ আবুল কালামের মতে, চে গুয়েভারা কেবল একজন বিপ্লবী নন; তিনি বিপ্লব ও প্রতিবাদের আন্তর্জাতিক প্রতীক। তার আত্মত্যাগ, আন্তর্জাতিকতাবাদী চিন্তা এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রাম প্রজন্মের পর প্রজন্মের তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ করে কিউবা বিপ্লবের পর বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হিসেবে তার পরিচিতি বিস্তৃত হয়।
আজাদ আবুল কালাম মনে করেন, চে’র প্রতীকী উপস্থিতি এখন আর শুধু রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের দৈনন্দিন জীবন ও সাংস্কৃতিক প্রকাশে। নতুন প্রজন্মের কেউ চে’র মতো বিপ্লবী হতে চান কি না, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। তার ছবি সংবলিত ক্যাপ বা টি-শার্ট পরা কিংবা তার ডায়েরি থেকে নেওয়া উদ্ধৃতি ব্যবহার করার মধ্য দিয়েও অনেকে চে’র প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করেন।
তার মতে, প্রতিবাদের ধরন নির্ভর করে ব্যক্তির রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর। শ্রেণিসংগ্রাম, বিপ্লব এবং মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিশ্বাসীদের একটি অংশ চে’র আদর্শ ধারণ করেন। আবার পোশাক বা প্রতীকের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন এমন তরুণেরাও নিজস্ব উপায়ে প্রতিবাদ জানান। তাদের এই প্রকাশের মধ্যে সমাজে পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে।
আজাদ আবুল কালামের এই পর্যবেক্ষণে চে’র জনপ্রিয়তার একটি দিক উঠে আসে। প্রতিকৃতিটি ব্যবহার করা মানেই যে ব্যবহারকারী তার জীবনের সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একমত, তা নয়। অনেকের কাছে এটি একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে- বৈষম্যহীন সমাজ, মানুষের অধিকার কিংবা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন।
তবে প্রতীকী আকর্ষণ আর রাজনৈতিক আদর্শ গভীরভাবে অনুধাবন করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। টি-শার্টে চে’র ছবি ধারণ করা সহজ; তার রাজনৈতিক দর্শন, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে বোঝাপড়া তৈরি করা তুলনামূলকভাবে জটিল।
চলচ্চিত্র, গান ও দেয়ালে চে
চে গুয়েভারার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে চলচ্চিত্র, সংগীত ও দৃশ্যশিল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৪ সালে ব্রাজিলীয় পরিচালক ওয়াল্টার সালেস নির্মিত দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ চলচ্চিত্রে চে’র তরুণ বয়সের ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা ও মানবিক উপলব্ধির গল্প তুলে ধরা হয়। এতে তাকে শুধু একজন রাজনৈতিক বিপ্লবী হিসেবে নয়, বৈষম্য ও মানুষের দুর্দশার মুখোমুখি হওয়া এক তরুণ হিসেবেও দেখা যায়।
২০০৮ সালে পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গ নির্মাণ করেন চে চলচ্চিত্রের দুটি অংশ- দ্য আর্জেন্টাইন ও গেরিলা। এতে তার বিপ্লবী জীবন ও সামরিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
দৃশ্যশিল্পেও চে’র প্রতিকৃতি বারবার ফিরে এসেছে। দেয়ালচিত্র, স্টেনসিল আর্ট ও গ্রাফিতিতে তার মুখ ব্যবহার করে শিল্পীরা বৈষম্য, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালেও তার প্রতিকৃতি দেখা যায়।
সংগীতেও চে’র উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। কিউবান গীতিকার ও সংগীতশিল্পী কার্লোস পুয়েবলার হাস্তা সিয়েমপ্রে, কোমান্দান্তে (Hasta Siempre, Comandante) গানটি তার স্মৃতি ও বিপ্লবী ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চে’র মৃত্যুর পর গানটি বিশ্বজুড়ে বিপ্লবী সংগীতের পরিচিত উদাহরণে পরিণত হয়।
চলচ্চিত্র, গান ও দেয়ালচিত্রে চে’র উপস্থিতি তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। একই সঙ্গে এসব শিল্পমাধ্যম তার ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নানা ধরনের ব্যাখ্যা তৈরি করেছে। ফলে চে এখন আর শুধু ইতিহাসের একটি চরিত্র নন; তিনি জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও অংশ।

পুঁজিবাদের বাজারে বিপ্লবের অর্থ
চে গুয়েভারার প্রতিকৃতির বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। কোনো রাজনৈতিক প্রতীক যখন বাজারের পণ্যে পরিণত হয়, তখন তার প্রতিবাদী শক্তির কী হয়?
একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফলে চে’র প্রতিকৃতি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরেও তার নাম ও মুখচ্ছবি পরিচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের কাছে। কেউ তার ছবি দেখে ইতিহাস জানতে আগ্রহী হতে পারেন, কেউ বিপ্লবী আদর্শ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, বাজারে প্রতীকের ব্যবহার তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে দুর্বলও করতে পারে। যখন একটি ছবি মূলত পোশাকের নকশা বা বিক্রির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেই ছবির পেছনে থাকা ইতিহাস, মতাদর্শ ও সংগ্রামের প্রসঙ্গ অনুপস্থিত থেকে যেতে পারে।
চে’র ক্ষেত্রে দুই প্রবণতাই পাশাপাশি রয়েছে। তার প্রতিকৃতি যেমন প্রতিবাদী আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এমন পণ্যেও জায়গা করে নেয়, যেগুলোর সঙ্গে তার রাজনৈতিক দর্শনের সরাসরি সম্পর্ক নেই। ফলে ছবিটি একই সঙ্গে বিপ্লবী স্মৃতি এবং বাণিজ্যিক সংস্কৃতির অংশ।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চে’র প্রতিকৃতি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি সাধারণ ব্র্যান্ডের মতো নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিল্পী, প্রকাশক, ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারী ছবিটির নানা সংস্করণ তৈরি করেছেন। ফলে এর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাস, শিল্পের পুনরুৎপাদন, গণমাধ্যম ও বাজারের সম্মিলিত ভূমিকা।
তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতীকটির অর্থ পুরোপুরি মুছে যায়নি। বরং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। কেউ ছবিটিকে বিপ্লবী চেতনার স্মারক হিসেবে দেখেন, কেউ ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করেন, আবার কেউ এর মধ্যেই দেখেন রাজনৈতিক আদর্শের বাজারীকরণের উদাহরণ।

যে মুখের অর্থ বদলায়, আবেদনও থাকে
সময়ের সঙ্গে রাজনীতির ভাষা বদলেছে, বদলেছে প্রতিবাদের ধরনও। কিন্তু চে গুয়েভারার পরিচিত মুখচ্ছবি এখনও রাজপথে, দেয়ালে কিংবা তরুণদের পোশাকে দেখা যায়। এর কারণ শুধু তার ঐতিহাসিক পরিচয় নয়; বরং ছবিটি যে নানা প্রজন্মের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করার সুযোগ তৈরি করেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চে’র প্রতিকৃতি আজ একই সঙ্গে বিপ্লবের স্মৃতি, তারুণ্যের বিদ্রোহী পরিচয়, শিল্পের নকশা এবং বাণিজ্যিক পণ্যের উপাদান। এই বহুমাত্রিকতার মধ্যেই রয়েছে এর জনপ্রিয়তার রহস্য।
পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন বিপ্লবীর মুখ যখন পুঁজিবাদের বাজারে বিক্রির উপকরণ হয়ে ওঠে, তখন বৈপরীত্যটি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেই বৈপরীত্যই চে গুয়েভারাকে নিয়ে আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। তার ছবি শুধু একজন মানুষের স্মৃতি বহন করে না; এটি মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক আদর্শ, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও বাজারের সম্পর্ক কতটা জটিল হতে পারে।
বিপ্লবের প্রতীক থেকে ফ্যাশনের অনুষঙ্গ-চে গুয়েভারার প্রতিকৃতির এই যাত্রা তাই কেবল একটি ছবির বিশ্বজয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন প্রতিবাদের প্রতীকও বাজারের অংশ হয়ে উঠতে পারে; আবার বাজারে ছড়িয়ে পড়েও কোনো প্রতীক মানুষের মনে রাজনৈতিক প্রশ্ন জাগিয়ে রাখতে পারে।