ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা যখন দৈনন্দিন জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা যখন দৈনন্দিন জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়
×
×

প্রতীকী ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৫

কাজের চাপ, পরীক্ষা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা— জীবনের নানা পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই দুশ্চিন্তা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ঘুম, কাজ, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাব ফেলে, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধার মুখে পড়েন। তাই সমস্যাটি বুঝতে পারা, সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো চেনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪৭ কোটি মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগেছেন। এ ধরনের সমস্যায় অতিরিক্ত ভয় ও দুশ্চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত করতে পারে। নারী ও মেয়েদের মধ্যে এ সমস্যার প্রবণতা পুরুষ ও ছেলেদের তুলনায় বেশি। উদ্বেগজনিত সমস্যার লক্ষণ শৈশব ও কৈশোরেও দেখা দিতে পারে।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কেন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়

কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে চিন্তা হওয়া কিংবা অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই বারবার খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা করা, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা করা কিংবা দুশ্চিন্তা থামাতে না পারা স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। এ অবস্থায় কাজে মনোযোগ দেওয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা অন্যের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দুশ্চিন্তার কারণে সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন, আবার কারও ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে মানসিক চাপের পাশাপাশি শারীরিক অস্বস্তিও বাড়তে পারে।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন

দুশ্চিন্তা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ পায় না। তবে কিছু লক্ষণ বারবার দেখা দিলে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

  • কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকলেও মনে হতে পারে, সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। কোনো সমস্যা সমাধান হয়ে যাওয়ার পরও তা নিয়ে দুশ্চিন্তা চলতে পারে।
  • একের পর এক চিন্তা মাথায় আসায় কাজে মন বসে না। পড়াশোনা, অফিসের কাজ কিংবা সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও অসুবিধা হতে পারে।
  • সব সময় চাপের মধ্যে থাকা, সহজে বিরক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা শান্ত হতে না পারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
  • রাতে ঘুম আসতে দেরি হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা ঘুমাতে গেলেই নানা চিন্তা মাথায় আসা। ঘুমের অভাব আবার ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, শরীর কাঁপা, পেশিতে টান, বমি বমি ভাব কিংবা পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তীব্র আতঙ্কের সময় শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গও হতে পারে।
  • মানুষের সঙ্গে কথা বলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া কিংবা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভয় কাজ করতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে পারে।
  • নিজের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেও বারবার একই বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকা। এতে কাজের সময় নষ্ট হয় এবং মানসিক ক্লান্তি বাড়ে।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কমাতে যা করবেন

দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর করা সব সময় সম্ভব নয়। তবে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মানসিক চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে।

  • দুশ্চিন্তা বাড়লে আরাম করে বসে ধীরে শ্বাস নিন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে শ্বাস ছাড়ুন। কয়েক মিনিট এভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চা শরীরের উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
  • প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন। শারীরিক কার্যকলাপ মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানোও উপকারী হতে পারে।
  • কোন বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে, তা লিখে ফেলুন। এরপর কোন বিষয়টি আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে এবং কোনটি নেই, তা আলাদা করে ভাবুন। এতে সমস্যা বুঝতে ও করণীয় ঠিক করতে সুবিধা হতে পারে।
  • মনের কথা কাছের কোনো বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিন। প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না।
  • অতিরিক্ত চা-কফি কিছু মানুষের অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন ও ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করুন।
  • দুশ্চিন্তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে কিংবা কাজ, ঘুম ও সম্পর্কে প্রভাব ফেললে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নিন। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) উদ্বেগজনিত সমস্যার কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতিগুলোর একটি। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ওষুধের পরামর্শও দিতে পারেন।

কখন সতর্ক হবেন

দুশ্চিন্তা মানেই মানসিক রোগ নয়। জীবনের চাপপূর্ণ সময়ে উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। তবে দুশ্চিন্তা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তখন বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। একই ধরনের কিছু লক্ষণ অন্য শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই নিজের লক্ষণ দেখে নিজেই রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মানসিক সুস্থতার জন্য নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সব দুশ্চিন্তা একা সামলানোর চেষ্টা না করে প্রয়োজনমতো সাহায্য নেওয়া, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করতে পারে। দুশ্চিন্তা যখন স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন নীরবে সহ্য না করে সাহায্য চাওয়াই সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন

×