সংবাদমাধ্যম
সাংবাদিকদের সিনেমাটি দেখা উচিত
মোছাব্বের হোসেন
মোছাব্বের হোসেন
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৮
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তোলা বিশ্ববিখ্যাত ‘নাপাম গার্ল’ ছবিটিকে বিশ্বের শক্তিশালী কয়েকটি ছবির সঙ্গে তুলনা করা চলে, যা বিশ্বের বিবেককে রীতিমতো নাড়িয়ে দিয়েছিল। অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) এই ছবিটির কৃতিত্ব আসলে কার– এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি গত ৫০ বছরেও। কিন্তু যখন এ নিয়ে একটি চলচ্চিত্র গত বছরে মুক্তি পেল, তাতে শুধু সাড়াই পড়ল না; তৈরি হলো আরেক ইতিহাস। আর তার তীব্রতা এত, এর জের ধরেই বিখ্যাত সেই আলোকচিত্রীর পদক বাতিলের মতো ঘটনাও ঘটে গেল ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফির ইতিহাসে।
বলছি বাও এনগুয়েন পরিচালিত ২০২৫ সালের প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্ট্রিংগার: দ্য ম্যান হু টুক দ্য ফটো’ সিনেমার কথা।। নেটফ্লিক্সে এটি মুক্তির পর থেকে সাংবাদিকতার জগতে গভীর এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূল আলোচনা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তোলা এপির বিশ্ববিখ্যাত ‘নাপাম গার্ল’ ছবির কৃতিত্ব নিয়ে। খালি গায়ে আগুনে পোড়া এক মেয়েশিশুর সঙ্গে যুদ্ধে আক্রান্ত মানুষের একটি ছবি। যুদ্ধের ভয়াবহতা বলতে এটি ব্যবহার হয়েছে কতবার, তার হিসাব বের করা মুশকিল। বহু বছর ধরেই মানুষ জেনে এসেছে, ছবিটি তুলেছেন এপির আলোকচিত্রী নিক উট। কিন্তু এই প্রামাণ্যচিত্র দাবি করছে, ছবিটি হয়তো তুলেছিলেন এক ভিয়েতনামি ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী। অর্থাৎ একজন ‘স্ট্রিংগার’, যিনি ইতিহাসে যথাযথ স্বীকৃতি পাননি, অথবা থেকে গেছেন অন্তরালে।
‘নাপাম গার্ল’ ছবি তুলে তারকাখ্যাতি পান এপির আলোকচিত্রী নিক উট। সাংবাদিকতার তারকা এই আলোকচিত্রী এই ছবির জন্য সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পুরস্কার পুলিৎজার পান। আর আলোকচিত্রীদের জন্য সবচেয়ে সম্মানের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোগ্রাফি পুরস্কারসহ আরও বড় বড় পদক বা পুরস্কার ও স্বীকৃতি আসে এই তারকা সাংবাদিকের ক্যারিয়ারে। সব কিছুই এই একটি ছবিকে কেন্দ্র করে। অথচ এই চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে– এই ছবি আসলে নিক তোলেননি। তুলেছেন অখ্যাত আলোকচিত্রী। যাকে কুরে কুরে খাচ্ছে নিকের এসব পুরস্কার। আর চলচ্চিত্রটি প্রকাশের পর যুক্তি মেনে নিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো নিকের পদক বাতিলের ঘোষণা দেয়।
এই প্রমাণের জন্য নির্মাতা সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন আলোকচিত্রীর ছবি, ম্যাপ, স্যাটেলাইট ইমেজ, কী ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়েছে, ছবির আসল দাবিদার– এই সম্পর্কিত ব্যক্তিদের বক্তব্য সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। সব কিছুর পর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন– আসল দাবিদার নিক উট এই ছবি তোলেননি। তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন ঠিকই, তবে ছবি তোলার সময় তিনি কিছুটা দূরে ছিলেন। ছবি তুলেছেন অন্য কেউ। এই যুক্তিকে আসলে মেনে না নেওয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না ওয়ার্ল্ড প্রেসের কর্তৃপক্ষের।
চলচ্চিত্রটি অনুসন্ধানধর্মী ভঙ্গিতে নির্মিত। এতে পুরোনো নথি, সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ দেখানো হয়েছে। নির্মাতা দেখাতে চেয়েছেন, যুদ্ধের সময় অনেক স্থানীয় ফটোগ্রাফার বিদেশি সংবাদ সংস্থার জন্য কাজ করতেন। তারা ঝুঁকি নিয়ে ছবি তুলতেন, কিন্তু সবসময় তাদের নাম ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লেখা হতো না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে উঠত, ব্যক্তি আড়ালে চলে যেত।
এই প্রামাণ্যচিত্র কেবল একটি ছবির গল্প নয়; এটি ক্ষমতা ও স্বীকৃতির গল্প। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব সংবাদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও তাদের নাম অনেক সময় আড়ালেই থেকেছে। চলচ্চিত্রটি সেই কাঠামোর দিকে আঙুল তোলে। প্রশ্ন তোলে– ইতিহাস কে লেখে; কার কণ্ঠ বেশি শোনা যায়; কার নাম সামনে আসে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশেও বহু ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী কাজ করেন। অনেক সময় তারা বড় আন্তর্জাতিক বা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন, কিন্তু সবসময় সমান নিরাপত্তা, স্বীকৃতি বা সম্মান পান না। হয়তো সামান্য কিছু টাকা দিয়ে তাদের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা হয় আন্তর্জাতিক বড় বড় সংবাদমাধ্যমে। এসব কাজে তো তাদের ঝুঁকি থাকে, কিন্তু নাম থাকে না। টাকাও নেই সেভাবে। এই বাস্তবতায় দ্য স্ট্রিংগার আমাদের নিজস্ব সাংবাদিকতা কাঠামো নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে।
চলচ্চিত্রটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে– স্মৃতি ও দলিলের সম্পর্ক। সময়ের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি বদলে যায়। সাক্ষাৎকার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো সবসময় শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে। তাই ইতিহাস সংশোধন করতে হলে আবেগ নয়, বরং কঠোর যাচাই প্রয়োজন। চলচ্চিত্রটি আবেগময়ভাবে গল্পটি উপস্থাপন করেছে, যা দর্শককে আকৃষ্ট করে। একই সঙ্গে এটি বিতর্কও তৈরি করেছে। বলা যায়, দ্য স্ট্রিংগার কোনো সহজ উত্তর দেয় না। এটি আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে; প্রশ্ন করতে শেখায়। এটি দেখায় যে, সাংবাদিকতা শুধু খবর প্রকাশের কাজ নয়। এটি ইতিহাস সংরক্ষণ ও সঠিক কৃতিত্ব দেওয়ার দায়িত্বও বহন করে। সত্য অনুসন্ধান যেমন জরুরি, তেমনি দায়িত্বশীলভাবে সেই সত্য প্রকাশ করাও জরুরি। এই কারণেই শুধু একটি প্রামাণ্যচিত্র নয়; এটি সাংবাদিকতার ন্যায়, স্বীকৃতি ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার জায়গা।
মোছাব্বের হোসেন: যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত
- বিষয় :
- সংবাদমাধ্যম