সুরক্ষা
দুর্যোগ সহনশীলতার সূচনা হোক ঘর থেকে
শশাঙ্ক সাদী
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৪ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৪
কল্পনা করুন বরগুনা, বাগেরহাট কিংবা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপকূলের একটি পরিবারকে। রাতে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হয়েছে। পরিবারের ১০ বছরের মেয়েটি সবার আগে তার স্কুলের বইগুলো পলিথিনে মুড়িয়ে নিল। তার ৮ বছরের ছোট ভাইটি হাতে নিল ছাগলের দড়ি। তাদের মা গুছিয়ে নিলেন জরুরি কাগজপত্র; নগদ সঞ্চয় আর বাসনকোসন তুলে রাখলেন একটা উঁচু তাকে বা শিকায়। বাবা দাদিকে ধরেন এগিয়ে যাওয়ার জন্য। পুরো পরিবারটি রওনা দেয় পরিচিত এক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। তাদের ঘরটি আগের ঝড়ের পর উঁচু করে তোলা একটি ভিটির ওপর শক্তভাবে দাঁড়িয়ে। ঝড় থেমে গেলে হয়তো তাদের চালের কিছু অংশ আর এক মৌসুমের সবজি হারিয়ে যাবে, কিন্তু কোনো প্রাণহানি হবে না। আর মেয়েটি ও তার ছোট ভাইয়ের বইগুলো অক্ষত থাকবে।
এই পরিবারটির গল্প কোনো ব্যতিক্রমী উদাহরণ হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের মৌলিক একক। কিন্তু আমরা প্রায় এ সত্যটি ভুলে যাই। আমরা বাঁধ নির্মাণ করি; পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করি এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোতে স্বাক্ষর করি।
দুর্যোগে প্রাণহানিতে বৈসাদৃশ্য
১৯৯৫ সালে কোবে ভূমিকম্পে জাপানের সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রাণ হারান ছয় হাজার ৪৩৪ জন মানুষ এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এক লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি। এরপর জাপান তার নির্মাণের মান আরও কঠোর করে এবং পরিবারগুলো নিজেরা কী করতে পারে তার ওপর জোর দেয়। যেমন আসবাব দেয়ালে বেঁধে রাখা, দরজার কাছে জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, দুর্যোগের সময় জরুরিভাবে কোথায় মিলিত হবে তা আগে থেকে ঠিক করে রাখা। অর্থাৎ একেবারে পারিবারিক পর্যায়ের দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা। বছরের পর বছর দুর্যোগ-প্রস্তুতি শিক্ষা ও মহড়ার ফলে ২০১১ সালে উপকূলীয় শহর কামাইশিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯৯.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সুনামি থেকে বেঁচে যায়। বেশির ভাগ শিশু বড়দের জন্য অপেক্ষা করেনি। তারা নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং ছোটদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। শিশুরাই হয়ে উঠেছে দুর্যোগ সহনশীলতার অংশ।
যেখানে ঘর দুর্বলতম বিন্দু
ইরানের উদাহরণ দেখিয়ে দেয়, ঘরবাড়ি যদি দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় রেখে তৈরি না হয় তাহলে কী হতে পারে। চীনের অভিজ্ঞতাও একই দিকনির্দেশ করে, তবে বিশাল পরিসরে। ২০০৮ সালের সিচুয়ান ভূমিকম্পে প্রাণ হারান প্রায় ৮৭ হাজার মানুষ। সরকারি হিসাবে নিহত বা নিখোঁজ শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি। আশপাশের অনেক ভবন অক্ষত থাকলেও স্কুলগুলো ধসে পড়ায় জনরোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। চীন সরকারের দৃষ্টিও সেদিকে নিবদ্ধ হয়। এ ভূমিকম্পের পরপর চীন গ্রামীণ আবাসন ও বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য উচ্চতর ভূমিকম্প-সহনীয় মান অনুসরণ করে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়। তবে যখন পুনর্গঠন মূলত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন একটি প্রশ্ন থেকে যায়, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান বণ্টনের সুযোগ পরিবারগুলো কতটা পায়? এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। তা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও মালিকানাবোধের ওপরেও নির্ভর করে।
পরিবার শুধু ভুক্তভোগী নয়, নির্মাতা
নেপালের ২০১৫ সালের গোর্খা ভূমিকম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ একটি ভিন্ন মডেল তুলে ধরে। এই ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতায় প্রাণ হারান প্রায় আট হাজার ৭০০ মানুষ; আহত হন প্রায় ২৫ হাজার; ধ্বংস হয় প্রায় চার লাখ ৯০ হাজার ঘরবাড়ি। আরও দুই লাখ ৬৫ হাজার ঘর সাময়িকভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। নেপাল সরকার গ্রহণ করে মালিকানাচালিত পুনর্গঠনের পথ। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নেতৃত্বে পুনর্বাসন। মালিকানাচালিত নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শর্ত সাপেক্ষে কিস্তিতে নগদ অনুদান পায়। শর্ত থাকে অনুমোদিত নিরাপদ নকশা অনুসারে ঘর পুনর্নির্মাণের। পাশাপাশি হাজার হাজার স্থানীয় প্রকৌশলী ও রাজমিস্ত্রিকে ভূমিকম্প-সহনীয় নির্মাণ ও মেরামত কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ভারত এই শিক্ষা পেয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ধরনের দুর্যোগ থেকে। ২০০১ সালের গুজরাট ভূমিকম্পে সরকারি হিসাবে প্রাণ হারান প্রায় ২০ হাজার মানুষ। পুনর্গঠনের বড় অংশে ঘরের মালিকদের রাখা হয় পরিকল্পনার কেন্দ্রে। তাদের দেওয়া হয় নিরাপদভাবে পুনর্নির্মাণের কারিগরি সহায়তা।

উড়িষ্যায় ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোনে প্রাণ হারান প্রায় ১০ হাজার মানুষ। এর পর থেকে রাজ্যটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছে; প্রশিক্ষণ দিয়েছে কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের এবং উন্নত করেছে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় ফাইলিন উড়িষ্যায় আঘাত হানলে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিলে মৃত্যুর সংখ্যা থেকে যায় মাত্র কয়েক দশকের ঘরে। আহমেদাবাদে তাপ-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা ও স্বল্পব্যয়ী ঠান্ডা-ছাদ পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে যে ধীরগতির নীরব আপদও মোকাবিলা করা যায় ঘর ও ছাদের স্তরে।
বাংলাদেশের যা বলার আছে
বাংলাদেশে ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারান যথাক্রমে তিন লাখ ও এক লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন। অথচ ২০০৭ সালের আরেকটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সিডরে প্রাণ হারান তিন হাজার ৩৬৩ জন। আশ্রয়কেন্দ্র, উন্নত বাঁধ, উন্নততর পূর্বাভাস এবং কমিউনিটিভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই মৃত্যুহারে এই নাটকীয় পতনের ব্যাখ্যা দেয়।
তবে একটি স্তর প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যারা সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন ঘরে ঘরে। বিপদাপন্ন পরিবারগুলো তাদের ভিটে উঁচু করে; জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান সবজি বাগান করে; দুর্যোগকালের জন্য বীজ ও খাদ্য মজুত রাখে। এসব কখনও শিরোনাম হয় না। অথচ বড় দুর্যোগের সময় মৃত্যুহার কমানো অনেকটা নির্ভর করে ঘরে ঘরে নেওয়া এসব পদক্ষেপের ওপর।
এখনও অনেক কাজ বাকি। ঢাকাসহ দেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষের এমন ভবনে বসবাস, যা কখনও ভূমিকম্প-সহনশীলতা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি বা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। অনানুষ্ঠানিক বহু বসতি গড়ে উঠেছে বন্যাপ্রবণ জমি ও পাহাড়ি ঢালে, যেখানে বাসরত জনগোষ্ঠী মুখোমুখি হয় ভূমিধসের। কক্সবাজারে অস্থায়ী আশ্রয়ে বাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারগুলো প্রতি বর্ষায় ঢালু জমিতে ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়ে।
শিশুদের মতামত নিন
শিশুরা শুধু বড়দের ছোট আকারের মতো নয়। তারা দুর্যোগ ঝুঁকিকে ভিন্নভাবে দেখে। একটি শিশুর কাছে দুর্যোগ মানে কেবল বাতাস বা ঢেউ নয়। তার কাছে ঝুঁকির অর্থ সেই স্কুল, যা সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ থাকে; সেই ইউনিফর্ম যা হারিয়ে যায়; সেই বন্ধু যে আর ফিরে আসে না। কিংবা সেই ভয়, যার ব্যাখ্যা কেউ দেয় না। সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা ও প্রতিবেদনে জানা যায়, দুর্যোগ এবং তার পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কার সঙ্গে স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক গভীর, বিশেষত কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে।
আমাদের জন্য চারটি শিক্ষা
দেশগুলোর এসব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারক এবং আমাদের মতো যারা কমিউনিটির পাশাপাশি কাজ করেন তাদের জন্য চারটি শিক্ষা তুলে ধরে। প্রথমত, নিরাপদভাবে নির্মাণ করুন এবং মান প্রয়োগ করুন। দ্বিতীয়ত, পরিবারগুলোকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুন। তৃতীয়ত, সক্ষম করাকে দায় ঝেড়ে ফেলার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। চতুর্থত, শিশুদের কথা শুনুন।
এটি শুরু, শেষ নয়
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের সেন্দাই কাঠামো দেশগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং ‘আরও ভালোভাবে পুনর্নির্মাণ’ করতে আহ্বান জানায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ব-দ্বীপের একটি গ্রাম কিংবা নেপালের একটি পাহাড়ি জনপদ থেকে দেখলে এই কথার অর্থ একেবারে সরল: এমন একটি ঘর, যা টিকে থাকে; এমন একটি পরিবার, যে জানে কী করতে হবে; এমন একটি সমাজ ও সরকার, যা বিপদের মুহূর্তে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়। পরীক্ষিত সত্য হলো, প্রতিটি সহনশীল জাতির গোড়াপত্তন শেষ পর্যন্ত হয় লাখ লাখ সহনশীল ঘর ঘিরে। আমাদের বিনিয়োগ করা উচিত সেভাবেই। ঘর থেকেই শুরু করি দুর্যোগ-সহনশীলতা গড়ার কাজ।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক