অর্থনীতি
সমাজে অবিশ্বাস, ব্যাংকে অনাস্থা
মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ
মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৪
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের বীজটি কয়েক দশক আগে অঙ্কুরিত হলেও আজ বিষবৃক্ষ। আমাদের ঋণ ইতিহাসে দেখা যায়, কৃষিবিপ্লবের শুরুর দিকে প্রযুক্তি অভিযোজনকল্পে সরকারি ব্যাংকগুলো মূলত বিদেশি তহবিল থেকে কৃষি ঋণ দিত। সেই কৃষি ঋণ পরিশোধ না করে পার পাওয়ার বিষয়টি জনবিশ্বাসে ঢুকে গিয়েছিল। কারণ, প্রতিটি সরকারই ‘ঋণ বিতরণ ও মওকুফ নীতি’ অনুসরণ করেছে! তা ছাড়া শিল্প খাতে বিনিয়োগেও সরকারি সমর্থন ছিল। প্রথমে শিশু শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং তারপর রুগ্ণ শিল্পের জন্য সুদ মওকুফ ও অতিরিক্ত ঋণও দেওয়া হতো। কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিয়ে সরকারি ছাড়নীতির সুযোগে অনেকে পুলকিত মনে ঋণখেলাপি সেজেছে। এখন কোনো ঋণগ্রহীতাই যেন টাকা ফেরত দিচ্ছে না! এদিকে লুটকৃত অর্থ আদায়ে ব্যাংকগুলোও নিষ্প্রভ। অনেক ব্যাংক জনগণের জমানো টাকাও ফেরত দিচ্ছে না! তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাপানো টাকা সরবরাহ করে তাদের বাঁচিয়ে রাখছে!
এই অবারিত লুটপাট থামাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচারিক কাঠামোও যেন অকার্যকর ছিল! সরকারি নির্দেশনা ও হস্তক্ষেপের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই দন্তবিহীন বাঘ হয়ে গেছে। দ্য ট্রাস্ট গ্যাপ প্রজেক্ট কর্তৃক ২০২৬ সালে প্রকাশিত সূচকমান আমাদের দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও দুর্বল জন-আস্থাকে নির্দেশ করছে। আর কাঠামোগত সক্ষমতা ও জন-আস্থার ব্যবধান সূচক (+৭.২) সামষ্টিকভাবে রাষ্ট্রের এবং ক্ষুদ্র পরিসরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানেরও ভঙ্গুরতা প্রকাশ করছে। দেশে খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তিতে অর্থঋণ আদালত কাজ করে। এই বিশেষায়িত আদালত ঋণ আদায়ের নিমিত্তে ব্যাংকের পক্ষে বন্ধকি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করতে পারেন। রায় কার্যকর করতে ঋণখেলাপিকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দিতে পারেন। শুধু দেনা পরিশোধের চাপ তো কঠোর শাস্তি নয়। এই শিথিল শাস্তির প্রয়োগেও যদি অনিশ্চয়তা থাকে, তবে ঋণখেলাপি তো দূরের কথা, কোনো অপরাধই থামবে না।
এ দেশে খেলাপিদের ধরে দণ্ড প্রয়োগের নজির খুবই কম। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট কর্তৃক প্রণীত আইন প্রয়োগ সূচকে ১.০-এর স্কেলে ০.৩৯ মান নিয়ে আমরা বিশ্বে ১২৪তম স্থানে রয়েছি। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে পাঁচ থেকে সাত বছর লাগছে। আইনি প্রবাদ বলে, ‘বিলম্বিত বিচার মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া’। তাই ব্যাংকগুলোও মামলা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে! এদিকে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি হয়ে কোনো ব্যক্তি যখন অতিকায় পুঁজিপতি বনে যায়, তার বিচার করে অর্থ আদায় কি সহজ?
খেলাপি ঋণের নামে এত সুনাম বৈপরীত্য তৈরিতে কোন অংশীজনের কৃতিত্ব বেশি? পুঁজির চাহিদা পূরণে দেশের উৎপাদক-ব্যবসায়িক শ্রেণি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। তবে বহু শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী দেনা পরিশোধ না করে ঋণখেলাপি নাম ধরেছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণেই ঋণবাজার বিপর্যস্ত। আমানত সুরক্ষা ও লেনদেনের ঝুঁকি দূরীকরণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ! এ জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তা ছাড়াও প্রচ্ছন্ন অংশীজন জড়িত। ঋণ গ্রহণ এবং সুদ মওকুফে একশ্রেণির পুঁজিপতি ও রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অপব্যবহার করেছে। যদিও সরকারি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আগ্রাসন বেশি ছিল, তবে বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকেই কি হস্তক্ষেপ হয়নি? একটি অর্থনৈতিক দৈনিক ২০১৩ সাল থেকে ৩১টি বেসরকারি ব্যাংকের ওপর ৭০-এর স্কেলে কর্মক্ষমতার স্কোর তৈরি করছে।
২০২৪ সালে সেরা তিনটি ব্যাংকের স্কোর ৪০-এর অধিক হলেও নিচের তিনটির স্কোর ৫-এর কম। দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক, এবি ব্যাংকের স্কোর ২.৭৯। নব্বইয়ের দশকে আমার চাকরিকালে যার নাম ছিল আরব বাংলাদেশ ব্যাংক। হাবভাবে মুগ্ধ জনৈক গ্রাহকের জিজ্ঞাসা ছিল, বেতন রিয়ালে নাকি টাকায় হয়? রসে ভরা উত্তরও ছিল, যখন যেটার পর্যাপ্ততা থাকে। সেই ব্যাংকের এত অবনমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। অনেকের অবনতি হলেও কতিপয় ব্যাংক তো উন্নতিও করেছে। নিজ নিজ ব্যাংক বাঁচাতে পরিচালনা পর্যদ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা কতইবা নিয়মতান্ত্রিক ছিলেন।
একে তো সামাজিক বিশ্বাসে হতাশা, তার ওপর ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতা থেকে জনগণ কী করছে? প্রথমত, টাকা ব্যাংকে না রেখে বিত্তশালী ব্যক্তিরা জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণ কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যয় করছেন। টাকা খাটিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনীতির ভাষায় সেটা বিনিয়োগ নয়। দ্বিতীয়ত, আমজনতা নানারূপ মাল্টি লেভেল কোম্পানি ও অনানুষ্ঠানিক সমিতির লোভনীয় ফাঁদে পড়ছে। তৃতীয়ত, কিছু লোক অনলাইন জুয়া ও পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কে ক্রিপ্টোকারেন্সির অবৈধ লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে পুঁজি বিনিয়োগ নয় বরং পুঁজি পাচারই চলছে। এদিকে নতুন সরকার পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। শুনছি সরকার তিন ধাপে আর্থিক সুরক্ষা জাল তৈরির কর্মপরিকল্পনা করছে। প্রথমেই খেলাপি ঋণ কমানোর সফল মডেল খুঁজতে হবে। আমরা জানি, ১৯৯৭ সালে চীনে ২৫ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ ছিল। সেই ঋণ আদায়ে সরকার শুধু আইনি কাঠামোতে নয়, বরং ব্যক্তির সামাজিক পুঁজি খর্ব করতেও কৌশলী ভূমিকায় ছিল। ফলে ২০১১ সালের মধ্যে চীনের খেলাপি ঋণ ১ শতাংশে নেমে আসে। আমাদের সংসদ সদস্যরা কি জনস্বার্থে খেলাপি ঋণ আদায়ে এতটা কঠোর ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবেন?
ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]