ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

স্থায়ী ঠিকানা সংকট

মন্ত্রীর ধমক বা আনুকূল্যে নয়, আইনি সমাধান হোক!

মন্ত্রীর ধমক বা আনুকূল্যে নয়, আইনি সমাধান হোক!
×
×

আকম সাইফুল ইসলাম

আকম সাইফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৭

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে মিশন আচার্যের নিয়োগপত্র জারি নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান তাঁর জেলার বাস্তুহীন একজন প্রার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে সচেতন নাগরিকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে এক ভিডিও ক্লিপে দেখা গেল, শিক্ষামন্ত্রী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধমকে সংবিধান শেখালেন।

টেলিফোনে তিনি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করছিলেন সংবিধানে কোথায় বলা আছে– স্থায়ী আবাসন না থাকলে চাকরি হবে না? প্রশ্নটা খুবই সহি এবং জেলা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে খেই হারাবেন, সেটাও স্বাভাবিক। জেলা কর্মকর্তা অধিদপ্তরের মতামত চেয়েছেন বলে মন্ত্রীকে অবহিত করেন। ক্লিপটি এটুকুই। পরে দেশবাসী জেনেছেন মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মিশন আচার্য কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্রটি পেয়েছেন। সংকটটি তৈরি হয়েছিল সরকারি নীতিমালার কারণেই।  

যে কোনো সরকারি চাকরির মতোই ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫’-এর বিধি ৪(৩)(ক)-এর পাঠ: ‘(৩) কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য কোনো ব্যক্তি যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন না, যদি তিনি (ক) বাংলাদেশের নাগরিক না হন অথবা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হন অথবা বাংলাদেশে ডমিসাইল না হন।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিক অথবা স্থায়ী বাসিন্দা অথবা ডমিসাইল এই তিনটির যে কোনো একটি হলে নিয়োগের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন। 

কেউ বাংলাদেশের নাগরিক কিনা তা নির্ধারিত হয় ১৯৫১ সালের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা। সেই আইনে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী ও বাংলাদেশের নাগরিক পিতা-মাতার সন্তান জন্মগতভাবেই বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগের জন্য বাংলাদেশের নাগরিক কিনা তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় কোন উপজেলা/থানার বাসিন্দা। বর্ণিত নিয়োগ বিধির ৭(২)(ক) বিধিতে বলা আছে– ‘শিক্ষক নিয়োগ উপজেলা ও ক্ষেত্রমতো থানাভিত্তিক হবে।’ সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য একজন ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হয় তিনি সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানার বাসিন্দা বিধায় আবেদন করার যোগ্য। বিবাহিত নারী প্রার্থীরা স্বামী বা পিতার স্থায়ী ঠিকানার যে কোনো একটিতে আবেদন করতে পারেন। 

দেশের কোন আইনে স্থায়ী ঠিকানা বা বাসিন্দার সংজ্ঞা নেই। অভিধানে ঠিকানা অর্থ বাসস্থান বা কর্মস্থলের বিবরণ, সন্ধান, খোঁজ দেওয়া আছে এবং বাসিন্দার অর্থ দেওয়া আছে বসবাসকারী, অধিবাসী (স্থায়ী বাসিন্দা)। তার মানে, ঘুরেফিরে স্থায়ী ঠিকানার সঙ্গে স্থায়ী বাসস্থানের ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। নদীভাঙন, ঋণের দায়, বিক্রয় বা হস্তান্তর, বন্ধক, সংযোগ ছিন্নতা, শত্রুতাসহ নানা কারণে চৌদ্দপুরুষের ভিটা হিসেবে কথিত স্থায়ী ঠিকানায় ব্যক্তির আবাসন অথবা দখল নাও থাকতে পারে। স্থায়ী ঠিকানার জন্য একসময় কোনো প্রমাণকের আবশ্যক না থাকায় সরকারি আবাসন, ভাড়া বাড়ি, অন্যের ঠিকানাকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করেছেন। জন্মনিবন্ধন সনদ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র আর তা ব্যবহার করে পাসপোর্ট। ফলে অভিযোগ আছে ভূরিভূরি রোহিঙ্গা শরণার্থী ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট হাসিল করেছেন। 

এসব বিবেচনায় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ২(১)(২১)-এ ‘স্থায়ীভাবে বসবাসের ঠিকানা অর্থ কোনো ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা বা কোনো ব্যক্তি যে স্থানে ন্যূনতম তিন বৎসর যাবৎ বসবাস করিতেছেন অথবা নদীভাঙন বা অন্য কোনো কারণে স্থায়ী ঠিকানা বিলুপ্ত হওয়ায় নূতন কোনো স্থানে যে কোনো সময়ের জন্য বসবাস করিতেছেন বা নূতন কোনো স্থানে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করিয়া যে কোনো সময়ের জন্য উক্ত স্থানে বসবাস করিতেছেন’ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই বিধিমালার ৯(ক)(আ) উপবিধিতে জন্মনিবন্ধন করার সময় ‘ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ হিসাবে ব্যক্তির নিজের বা পিতা বা মাতা বা পিতামহ বা পিতামহীর দ্বারা স্বনামে স্থায়ী ঠিকানা হিসাবে ঘোষিত আবাসস্থলের বিপরীতে হালনাগাদ কর পরিশোধের প্রমাণপত্র অথবা পিতা বা মাতা বা পিতামহ বা পিতামহীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টে ঘোষিত স্থায়ী ঠিকানা বা অন্য কোনো প্রমাণপত্র’ দাখিলের বিধান করা হয়েছে। 

এই সংজ্ঞা ও উপবিধির কারণেও অনেক শিশু জন্মনিবন্ধন করতে পারছে না। যারা কোনো কারণে  পূর্বপুরুষের ভিটা থেকে সংযোগবিচ্ছিন্ন হয়েছেন এবং নিজস্ব কোনো স্থাবর সম্পদ নেই, পরের বাড়িতে ভাড়া থাকে, বস্তি, রেললাইন বা সড়কের পাশের সরকারি জমিতে ঝুপড়ির মধ্যে যাদের বসবাস তাদের স্থায়ী ঠিকানা কী হবে? বেদে পরিবার– নদীর ওপরে ভাসমান নৌকাতেই যাদের সংসার, তাদের স্থায়ী ঠিকানা? কয়েক পুরুষ ধরে বাংলাদেশে বাস করলেও চা-বাগানের শ্রমিক কিংবা ধাঙড়দের নামে কোনো বসতভিটার পরচা নেই, হোল্ডিং ট্যাক্স নেই। পতিতালয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুর ঠিকানাই-বা কী হবে? জন্মপরিচয়হীন শিশু সমাজকল্যাণের সেবাকেন্দ্রে বা এতিমখানায় লালিতপালিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় তার স্থায়ী ঠিকানার সংকট মেটে কীভাবে? অথচ তারা সবাই জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। 

তাহলে কি নিয়োগবিধিতে ‘বাংলাদেশের নাগরিক না হন’ বাক্যাংশের পরে অথবার পরিবর্তে এবং বসিয়ে পরবর্তী বাক্যাংশ ‘বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হন’ হবে? তা না হলে তো নাগরিক হলে স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকে না। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক মিশন আচার্য তাঁর পিতার কাছ থেকে পদবি ছাড়া পার্থিব কিছুই পাননি। আজন্ম সম্পর্কহীন পিতার বসতভিটার ঠিকানা কি তাঁর অস্তিত্বের জন্য এতই গুরুত্বপূর্ণ?  

সব সরকারি চাকরির মতোই সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রাক-চাকরি যাচাই হয়ে থাকে। বিধি বলছে, ‘প্রার্থী সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন হতে হবে; যাচাইয়ে অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলে নিয়োগের সুপারিশ করা যাবে না।’ পুলিশ ভেরিফিকেশন রোলে সাধারণত চাকরিপ্রার্থীর নাম-পরিচয়, বর্তমান ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা এবং ঠিকানার সত্যতাসহ  প্রায় এক ডজন তথ্য যাচাই করা হয়ে থাকে। কোনো ব্যক্তির  স্থায়ী ঠিকানা না থাকলে বা ঘোষিত স্থানীয় ঠিকানায় আবাসন না থাকলে পুলিশ কি স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের কলামে সঠিক লিখবে? সেটা সম্ভব না বলেই মিশন আচার্যের ‘স্থায়ী ঠিকানায় কোনো আবাসন নাই’ মর্মে পুলিশ প্রতিবেদন দিয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদন শতভাগ ইতিবাচক না হওয়ায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে প্রতিবেদনটি ‘উপযুক্ত’ বিবেচনা করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি বলেই তিনি অধিদপ্তরের মতামতের জন্য পাঠিয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী জেলা কর্মকর্তাকে আবাসন না থাকলে বানিয়ে দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন। এ পরামর্শ সরকারি আদেশে পরিণত হলে অনেক বাস্তুহীন মানুষই আশান্বিত হবেন বৈকি!

ধরুন, স্থায়ী ঠিকানাবিহীন কেউ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিসিএস, ব্যাংক বা সরকারের সংবেদনশীল কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের সুপারিশ পেলেন। এবারে শিক্ষামন্ত্রী যে প্রাঞ্জল ভাষায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বুঝিয়েছেন তাতে করে ভবিষ্যতে অন্য কোনো নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ঠিকানা সম্পর্কে পুলিশের নেতিবাচক মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও নিয়োগপত্র দিলেন। পরে উদ্ঘাটিত হলো যে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভিনদেশি কিংবা কোনো গুরুতর অপরাধ ঢাকতে ঠিকানা ভাঁড়িয়েছিলেন, সে ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কি প্রশ্নবিদ্ধ হবেন না? নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কি মিশন আচার্যের উদাহরণ দিয়ে পার পেয়ে যাবেন? কুমিল্লার লালমাইয়ের ভূমিহীনের সন্তান তাছলিমা আক্তার স্থানীয় সংসদ সদস্যের আনুকূল্যে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। সাতবার নদীভাঙনে বাস্তুভিটাহীন হাতিয়ার ক্লিন্টন সাহা চট্টগ্রাম মহানগরীতে থানা পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়েও সহকারী শিক্ষকের নিয়োগপত্র পেতে কারও সুনজরের অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করছেন।

প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা না থাকলে বা ঘোষিত স্থায়ী ঠিকানায় আবাসন না থাকলে কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা আইনানুগভাবে নির্দিষ্ট করার সময় এসেছে। মিশন আচার্য, তাছলিমা আক্তার বা ক্লিন্টন সাহা বাংলাদেশের নাগরিক হলেও ঘোষিত স্থায়ী ঠিকানায় তাদের নিজস্ব আবাসন নেই। মহানুভবদের আনুকূল্যে প্রথম দুজন ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। ক্লিন্টন সাহার বরাতে কারও আনুকূল্য জুটলে তিনিও নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন। তাদের বাইরে হয়তো আরও অনেকে আছেন, যাদের নাম মিডিয়ায় আসেনি। শুধু ধমকে বা কারও আনুকূল্যে নয়, আইনের ভাষায় নির্ধারিত হোক স্থায়ী ঠিকানা না থাকা নাগরিকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত। 

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন বা জাতীয় পরিচয়পত্র আইনে ‘স্থায়ী ঠিকানা’র জুৎসই সংজ্ঞা যুক্ত হতে পারে। যে সংজ্ঞা অন্য সব আইন ও বিধিতে প্রযোজ্য হবে। যার সুবাদে স্থায়ী ঠিকানাবিহীন অথবা ঘোষিত স্থানীয় ঠিকানায় আবাসনবিহীন নাগরিকদের জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থান– সবকিছু হবে নির্ঝঞ্ঝাট। আবার শরণার্থী বা ভিনদেশি কেউ যেন সেই সুবিধার অপব্যবহারও করতে না পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে।

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×