সমাজ
কন্যাশিশু: কবর বদলেছে, বদলায়নি নিষ্ঠুরতা
নাজনীন শাবানাম
নাজনীন শাবানাম
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৬
পবিত্র কোরআনের একটি প্রশ্ন আজও মানবসভ্যতার বিবেককে নাড়া দেয়– ‘আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা আত-তাকভির, আয়াত ৮-৯)। এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক নির্মম ইতিহাস, গভীর মানবিক আর্তনাদ এবং সভ্যতার প্রতি এক চিরন্তন চ্যালেঞ্জ।
ইসলাম-পূর্ব আরবের জাহিলিয়াতের যুগে কিছু গোত্রে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা ছিল। কোরআন সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে মানবিক ও নৈতিক প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছে। অথচ হাজার বছরের সভ্যতার পথ পেরিয়ে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার গর্ব নিয়ে দাঁড়িয়েও আমরা কি কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে পেরেছি? আজ হয়তো জীবন্ত কবর দেওয়ার সেই প্রথা অধিকাংশ সমাজে নেই, কিন্তু কন্যাশিশুর শৈশব, স্বাধীনতা, স্বপ্ন ও আত্মমর্যাদাকে প্রতিনিয়ত দমন করার নানা রূপ এখনও বিদ্যমান।
যৌন নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, শিক্ষাবঞ্চনা, পারিবারিক সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি এবং ভালোবাসার নামে প্রতারণা– এসবের মধ্য দিয়ে কন্যাশিশু ও নারী নানা ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু নারীকে অধস্তন ভাবার মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে পাল্টায়নি। তাই কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতাকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এর পেছনে থাকা সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকেও চিহ্নিত করতে হবে।
আমাদের সমাজে নারীর স্নেহ, কোমলতা, উদারতা ও ভালোবাসাকে মহৎ গুণ হিসেবে স্বীকার করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই মানবিক গুণগুলো কখনও কখনও শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ভালোবাসার নামে প্রতারণা, বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইল, আবেগকে পুঁজি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা সম্পর্কের অজুহাতে নির্যাতন– এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানবিক অনুভূতিকেও অপরাধীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। এখানে নারীর কোমলতা দায়ী নয়; দায়ী সেই মানসিকতা, যা অন্যের বিশ্বাসকে দুর্বলতা এবং ভালোবাসাকে অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায় মনে করে।
প্রেম ও ভালোবাসা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু ভালোবাসার নামে কাউকে ভয় দেখানো, জোর করা, অপমান করা কিংবা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া ভালোবাসা নয়; নিছক ক্ষমতার অপব্যবহার। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের আবেগ, বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা করা হলে তার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ভালোবাসার শিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি সুস্থ সম্পর্ক, সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা এবং আত্মমর্যাদার শিক্ষাও অপরিহার্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, নির্যাতনকারী সব সময় পুরুষ হন না; কখনও নারীও অন্য নারীর প্রতি নির্যাতনমূলক আচরণ করেন। পরিবারের কোনো নারী সামাজিক বৈষম্য, কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা দীর্ঘদিনের প্রচলিত সংস্কারের প্রভাবে কন্যাশিশুর প্রতি অন্যায় করতে পারেন। যে নারী নিজে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তিনি কখনও অজান্তে সেই বৈষম্য পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। মূল সমস্যা হলো বৈষম্যমূলক মানসিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার, যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কোনো ব্যক্তির আচরণে প্রকাশ পেতে পারে।
নির্যাতনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয় এমন প্রশ্নের মাধ্যমে– কেন সে প্রতিবাদ করেনি; কেন সে বিশ্বাস করেছিল; কেন সে আগে কাউকে জানায়নি।

তাহলে করণীয় কী? প্রথম পরিবর্তন আনতে হবে পরিবারে। ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার, শিক্ষা, পুষ্টি ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নিজের শরীরের সীমানা, সম্মতি, নিরাপদ আচরণ এবং বিপদে সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি আত্মরক্ষার মৌলিক কৌশল শেখানো, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং প্রয়োজনে কীভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা নিতে হয়, তা জানানো জরুরি। পরিবারে এমন আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশু নির্ভয়ে তারর অভিজ্ঞতা জানাতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর সুরক্ষাব্যবস্থা, হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সংগঠনকে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্যাতিত শিশুর চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন ও গোপনীয়তা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কন্যাশিশু শুধু কারও সন্তান, বোন কিংবা ভবিষ্যৎ মা নয়; সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তারও নিজস্ব স্বপ্ন, মতামত, অধিকার ও মর্যাদা রয়েছে। তাকে নিরাপদ রাখা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার ন্যায্য অধিকার। নারীর মূল্য শুধু মাতৃত্ব, সৌন্দর্য কিংবা পারিবারিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার মানবিক মর্যাদা স্বয়ংসম্পূর্ণ।
জাহিলিয়াতের যুগে জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুর আর্ত প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে– তার অপরাধ কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শুধু অতীতের বর্বরতাকে নিন্দা করলেই চলবে না; বর্তমানের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়, বরং দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি তার আচরণে।
কন্যাশিশুকে রক্ষা করার অর্থ তাকে ভয় নিয়ে বাঁচতে শেখানো নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, নিজের অধিকার বুঝতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। নারীর কোমলতাকে কঠোর করে তোলার চেয়ে সমাজের নিষ্ঠুরতাকে নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
নাজনীন শাবানাম: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমাজ