সমকালীন প্রসঙ্গ
অর্থনীতির সংকট নিছক সম্পদের ঘাটতিজনিত নয়
সাহিদ রেজা
সাহিদ রেজা
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৯
দেশের অর্থনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র একটি দেশের অবস্থান থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, বিপুল জনসংখ্যা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের শ্রম, উদ্যোগ ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই ধারায় যে ছেদ পড়েছিল, চলতি বছরেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাব অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৯%। আইএমএফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.৬%, আর চলতি বছরে তা হতে পারে ৩.২%। আর তার সহোদর বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৪% হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করা হলেও ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের নেতিবাচক প্রবণতা বজায় থাকায় বলা যায়– অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শুধু নীতিমালা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্থিতিশীল সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। উদ্যোক্তা যেন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন, সরকারকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আমদানি-নির্ভরতা ও জ্বালানি সংকট
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো আমদানি-নির্ভরতা। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানির দামেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বাড়তি মূল্য দিতে হয়।
ব্যাংক খাতের সংকট: অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি
ব্যাংক খাত মূলত আমানতকারীর আস্থা, সুশাসন এবং ঋণের যথাযথ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। তার কোনো একটা দুর্বল হলে আমানতকারী ও উদ্যোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই বিদ্যমান সংকটে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার কৌশল বাদ দিয়ে ব্যাংক খাতের কার্যকর পুনর্গঠনের দিকে এগোনো উচিত। দুর্দশায় নিপতিত ব্যাংকের সংখ্যা কম নয়। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা নিরীক্ষা, দায়ী মালিক ও পরিচালকদের জবাবদিহি, প্রয়োজন অনুযায়ী মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
যেসব ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তবে সেই সহায়তা হতে হবে শর্তযুক্ত, স্বচ্ছ এবং ফলাফলনির্ভর। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং অর্থের অপব্যবহার বন্ধ করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

খেলাপি ঋণ ও বন্ধ শিল্পকারখানা
খেলাপি ঋণের সঙ্গে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত অনাদায়ী ও বিতর্কিত ঋণ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে ব্যাংকের সম্পদ আটকে থাকে; নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না এবং অর্থনীতিতে অর্থের কার্যকর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে সব খেলাপি ঋণকে একইভাবে বিবেচনা করাও যুক্তিসংগত নয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎকারী এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। যারা অনিয়ম করে ঋণ নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, বাজার সংকট, জ্বালানি ঘাটতি বা অন্যান্য বাস্তব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ যাচাইয়ের ভিত্তিতে ঋণ পুনর্গঠন ও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা নয়, বাস্তবে কতটি কারখানা চালু হলো, কতজনের কর্মসংস্থান হলো এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে কতটা অগ্রগতি ঘটল, তারও হিসাব রাখতে হবে। সরকার নীতিগত সহায়তা দেবে, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও তদারকি নিশ্চিত করবে, আর বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই করে কার্যকর অর্থায়ন করবে– এই তিন পক্ষের সমন্বয় ছাড়া শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ সফল হবে না।
উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয়
ওপরের আলোচনার সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে; দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে; তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ পুনর্গঠনের জন্য পৃথক, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; চতুর্থত, জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্প উৎপাদন বাড়াতে হবে; পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সরকারের ভূমিকা হবে কার্যকর নীতিগত সহায়তা, নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাতকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ দিতে হবে; একই সঙ্গে অনিয়মের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও এ দেশের মানুষ কাজ করা, নতুন উদ্যোগ নেওয়া এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে শুধু সম্পদের ঘাটতি হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে ব্যবস্থাপনা, আস্থা, নীতির কার্যকারিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দৃষ্টিকোণ থেকেও। প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের সমন্বয়, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়ন এবং সহায়তার সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মানুষের উদ্যোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশ বর্তমান সংকট কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
ড. এ কে এম সাহিদ রেজা: সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই
- বিষয় :
- অর্থনীতি