ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬

জন জীবন

গরিবের সঞ্চয়ে কর কি রাজস্বের নতুন লক্ষ্য

গরিবের সঞ্চয়ে কর কি রাজস্বের নতুন লক্ষ্য
×

এম এম মুসা

এম এম মুসা

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৮ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে ইস্যু করা কয়েকটি চিঠির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ঢাকার কর অঞ্চলের একটি সার্কেল থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার প্রধান নির্বাহীর কাছে চিঠি গেছে। প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত প্রতিবেদন থেকে সংখ্যা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ করবর্ষে সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদ বাবদ ব্যয় ৬৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি; আর ২০২৪-২৫ করবর্ষে ৭১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বেশি। চিঠির অভিযোগ, এর ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা ও তা সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার কোনো প্রমাণ রিটার্নে নেই। তারপর ভাষা আরও কঠিন হয়েছে। আগের কর-মামলার নিষ্পত্তি, নাকি ‘ত্রুটিযুক্ত ও রাজস্ব-পরিপন্থি’। তাই ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত চার করবর্ষের মামলায় ব্যবস্থা নিতে হবে। ২০ সেপ্টেম্বর হাজির হতে বলা হয়েছে। নইলে ‘কোনো বক্তব্য নেই’ ধরে নিয়ে ব্যবস্থা। ওই দুই বছরের সুদের ওপর ১০ শতাংশ হিসাব করলে কর দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা। এটা আমার হিসাব। চিঠিতে কোনো অঙ্ক বলা নেই।

দ্বিতীয় চিঠিটি চট্টগ্রামের একটি কর সার্কেল থেকে একটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিওর কাছে পাঠানো হয়েছে; উৎসে কর নিয়ে। তৃতীয়টি চিঠির বিষয়ও এক; পাঠানো হয়েছে আরেকটি ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে। 

তিনটি চিঠি একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, ঘটনাটা কোনো একটি কার্যালয়ের বিচ্ছিন্ন ভুল নয়। ঢাকা আর চট্টগ্রামে, আগস্ট আর সেপ্টেম্বরজুড়ে, একই দিকে একই চাপ। এই চাপ পড়ছে সেই সদস্যদের ওপর, যাদের মাথাপিছু সঞ্চয় ও সুদ এতই কম যে তারা আয়করের আওতায়ই পড়েন না।

যাদের সুদে এই কর, তারা কারা
সংখ্যার আড়ালে মানুষ আছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী দেশে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ৬৩৩টি, সদস্য চার কোটি ৭৩ লাখ, তাদের সঞ্চয়ের স্থিতি ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। সুদের হার ৬ থেকে ১২ শতাংশ। মোট সঞ্চয়কে সদস্য সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে জনপ্রতি গড় ২০ হাজার ২৩৭ টাকা। সেই টাকার বার্ষিক সুদ এক হাজার ২১৪ থেকে ২ হাজার ৪২৮ টাকা। এর ওপর ১০ শতাংশ কর মানে বছরে ১২১ থেকে ২৪৩ টাকা। এটা গড়। আর গড়ের নিচে আছে অসংখ্য মানুষ, যাদের সঞ্চয় কয়েকশ টাকার। অথচ তারা আয়করের হিসাবে করদাতাই নন। চলতি অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকা। তাঁর সুদ-আয় সেই সীমার আধা শতাংশও নয়। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বলছে, দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশ হয়েছে। নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ। আগস্টেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। এই সময়ে সঞ্চয়ের সুদ বা মুনাফায় কর বসানো মানে ডুবতে থাকা মানুষের হাত থেকে ভেলাটাও কেড়ে নেওয়া।

ডান হাতে দেওয়া, বাঁ হাতে নেওয়া?
সরকারের নিজের ভালো উদ্যোগগুলোও এ সিদ্ধান্তের বিপরীত। গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছেন। নারীপ্রধান পরিবার মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা পাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা, যার ব্যয় ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে বাজেটে ধান-চাল, আটা, ডাল, তেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব ছিল। তার মানে সরকার জানে, গরিব কতটা চাপে আছে। তাহলে একই সরকারের রাজস্ব বোর্ড কী করে সেই নারীর সামান্য সঞ্চয়ের সুদ থেকে কর টানে, যার হাতে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পৌঁছাচ্ছে? 

সমাধানের পথ
এ সমস্যার সমাধান নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে না। ভারতে ব্যাংক-আমানতের সুদে উৎসে কর কাটা শুরুই হয় একটা সীমার পরে। বাজেট ২০২৫ থেকে সীমা সাধারণ আমানতকারীর জন্য ৫০ হাজার রুপি; প্রবীণ নাগরিকের জন্য এক লাখ রুপি। করযোগ্য সীমার নিচে যার মোট আয়, তিনি স্ব-ঘোষণাপত্র জমা দিলে কর কাটাই বন্ধ হয়। যুক্তরাজ্যে ব্যক্তিগত সঞ্চয়-ভাতা ও করমুক্ত আইএসএ হিসাব আছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ব্যক্তির ব্যাংক-সুদ সাধারণত করমুক্ত।

বাংলাদেশেও নজির আছে। সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে উৎসে কর ১০ নয়; ৫ শতাংশ। আর পেনশনভোগীর পাঁচ লাখ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে কোনো উৎসে কর নেই। এবার সঞ্চয়পত্রের উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যাতে করমুক্ত সীমার নিচের ছোট সঞ্চয়ীরা তা ফেরত নিতে পারেন। মানে এনবিআর নিজেই স্বীকার করেছে, ছোট সঞ্চয়ীর ওপর চূড়ান্ত উৎসে কর অন্যায্য। পার্থক্য কেবল একটা। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে সুবিধা আছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী নারীর ক্ষেত্রে নেই।

যা করা উচিত
সরকার আর আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক না করে আগে চিঠিগুলো স্থগিত করুক এবং জরিমানার দাবি তুলে নিক। তারপর এমআরএ, এনবিআর ও অর্থ বিভাগ বসে ঠিক করুক, ক্ষুদ্রঋণ সদস্যের সঞ্চয়ের সুদ একটি বার্ষিক সীমা পর্যন্ত উৎসে কর থেকে অব্যাহতি পাবে। সীমা পেরোলে স্বাভাবিক নিয়ম চলবে আর জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ভাগ করে ফাঁকি দেওয়ার পথও বন্ধ থাকবে। কর কমিশনার নিজেই বলেছেন, এমআরএ ছাড়ের প্রস্তাব দিলে এনবিআর তা বিবেচনা করতে পারে। এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বলেছেন, ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদে উৎসে কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয় এবং তিনি সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন। দুই সংস্থার একমত হতে বাধা নেই। দরকার শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।

এম এম মুসা: সাংবাদিক ও গবেষক 
 

আরও পড়ুন

×