ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বাজার

ব্যয়ের চাপে কী হবে আমাদের!

ব্যয়ের চাপে কী হবে আমাদের!
×
×

হাসান মামুন 

হাসান মামুন 

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশের আমদানিকারকদের বক্তব্য পর্যবেক্ষণকারীরা ধরেই নিয়েছিলেন, অক্টোবরে এলপিজির দাম বাড়বে। ইতোমধ্যে এর দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডার অবশ্য নির্ধারিত দামে মিলছে না বলেই খবর। গ্রাম পর্যন্ত এর সরবরাহ স্বাভাবিক হতে হয়তো সময় লাগবে। তারপরও এটা সব সময়েই পরিলক্ষিত– নির্ধারিত দামে এলপিজি মেলে না। মাঝে অনেক বেশি দামে এটা কিনতে হচ্ছিল। আর সেটা এমন এক সময়ে, যখন অন্য অনেক নিত্যপণ্যের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

কম ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রীর দামও সামনে কমে আসার সুযোগ নেই। দাম বৃদ্ধির প্রবণতাই জোরালো। এর প্রধানতম কারণ সেপ্টেম্বরে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ডিজেলসহ চারটি জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পরপরই বাস, ট্রাক ও নৌযানে ভাড়া বেড়েছে। পণ্য পরিবহনে ভাড়া নির্ধারণের আবার কোনো কাঠামো নেই। বাজারের ওপর নির্ভরশীল বলে এতে অনিশ্চয়তা বেশি। যা হোক, পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ায় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব পণ্যের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে হওয়া মূল্যস্ফীতির তথ্য পাওয়া যায়নি। মাঝে কিছুটা কমে আসা মূল্যস্ফীতি এখন বাড়বে বলে ধারণা। অনেকে বলছেন, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের তথ্য যখন দেওয়া হয়েছিল, তখনও মানুষ বাজারে গিয়ে সেটা অনুভব করতে পারেনি।

সেবার দামও বেড়ে চলেছে। এর একটি বড় সেবা খাত হলো রেস্তোরাঁ। সেখানে খাবারের দাম স্বভাবতই বাড়াতে হচ্ছে। কারণ এর উপকরণের দাম গেছে বেড়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা এটাও বলছেন, তাদের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষত কমেছে দামি আইটেমের বিক্রি। মাংসের তরকারির বদলে হয়তো সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে ভোক্তা।

মাঝে খবর মিলেছিল, বেকারি পণ্যের দাম আপাতত বাড়ানো হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর এমনটা জানানো হয়েছিল। খাতটির উদ্যোক্তাদের কিছু দাবি ছিল; যেগুলো পূরণ না হলে বেকারি পণ্যের দাম নাকি ২০ শতাংশ বাড়াতে হবে। এর আগেও বিপুলভাবে পরিভোগ হওয়া এসব পণ্যের দাম বেড়েছিল। দাম না বাড়িয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান আবার পণ্যের আকার কমায়। বেকারি পণ্যের দাম আরও বাড়লে কী দাঁড়াবে পরিস্থিতি? আয় বাড়াতে অক্ষম বিরাট জনগোষ্ঠী কি ক্রয় কমিয়ে দেবে? রেস্তোরাঁয় যেমন অনেকেই কমাচ্ছে খরচ!

রেস্তোরাঁ ও বেকারি খাত-সংশ্লিষ্টদের অন্যতম দাবি, জ্বালানি ব্যয় কমাতে হবে। মাঝে তাদের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জেরবার হতে হয়েছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও যাদের এলপিজি ব্যবহার করতে হয়; অক্টোবর থেকে তাদের ব্যয় নতুন করে বাড়বে। সম্পূরক শুল্ক আর উৎসে কর প্রত্যাহারেরও দাবি রয়েছে রেস্তোরাঁ মালিকদের। অভিযান পরিচালনা করে ‘একতরফা জরিমানা’ আদায় নিয়েও আপত্তি প্রবল।

ব্যবসা ভালো না থাকলে কেউই সরকারি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ভালোভাবে নেয় না। সরকারের ‘ব্যবসা’ও ভালো নয়। তার রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি খারাপ। এ কারণে হালে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত মনে হচ্ছে। নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার সম্ভাবনা কমই। এ অবস্থায় সরকারের রাজস্ব বেশি করেই লাগবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ব্যয় বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সেখান থেকে অবশ্য বাড়তি রাজস্ব মিলবে।

রাজস্ব আহরণের একটা বড় খাত জ্বালানি তেল। এসব পণ্যের ওপর আবার উচ্চহারে কর-শুল্ক আরোপিত। সেটা প্রত্যাহারের কথা কেউ বলে না। তবে হারটি সহনীয় করার চেষ্টাও পরিলক্ষিত নয়। কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে নয়; উচ্চ করের চাপেও জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। এখন এমনটিও বলা হচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য বাড়তি ব্যয় সামলাতেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। তাতে বিপিসির সাম্প্রতিক লোকসান কমবে; সরকারেরও রাজস্ব বাড়বে।

মাঝে কিছুটা কমানো হলেও এলপিজি আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য হারে ভ্যাট ধার্য করা আছে। অর্থাৎ বিকাশমান এ বাজার থেকেও সরকার কিছু রাজস্ব তুলছে। অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির উপকরণের দাম বাড়তে থাকার সময়টায় এর দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি যারা তুলছেন, তারা সরকারকে বলতে পারেন এর ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা। জরুরি পণ্যের দাম অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার তো এমনটা করেই থাকে। বিপুলসংখ্যক ভোক্তার দিকে তাকিয়ে যেমন রাজস্ব ছাড় দেয় রমজানের আগ দিয়ে।

এলপিজির বেলায়ও এটা করা যেতে পারে। কেননা, এর সরাসরি গ্রাহক প্রায় এক কোটি। এর মধ্যে বহু ছোট-বড় রেস্তোরাঁ ও বেকারি মালিক রয়েছেন। গ্যাস সংযোগ না পেয়ে; এমনকি সংযোগ পেয়েও এর সরবরাহ অস্থিতিশীল দেখে অনেকে এলপিজি ব্যবহারে অভ্যস্ত এখন। অটোগ্যাস হিসেবেও এর ব্যবহার বাড়ছে। এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে শিল্পকারখানায়। সমস্যা হলো, এর বাজার পুরোপুরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। তারা উল্লেখযোগ্য মুনাফা ছাড়া ব্যবসা করবে না। ছাড় দিলে দিতে হবে সরকারকেই। আন্তর্জাতিক বাজার স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ খাতে ভ্যাট ছাড় অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের ব্যবহারই সর্বাধিক। পরিবহন, সেচসহ অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিরাট। এটা বিবেচনা করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এতে কিছু শুল্ক কমানো হয়। অন্যান্য জ্বালানি তেলে মুনাফা করে ডিজেলে ছাড় দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষণীয়। মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার স্বার্থেই এটা করা হয়ে থাকে। এ অবস্থায় তাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা, সরকার ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ২০ টাকা বাড়ানোর পর অন্তত ১০ টাকা কমাক। মাঝে তো একবার অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও ডিজেলের দামে হাত দেওয়া হয়নি। তখনও জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল ছিল। এখনও তা-ই। সঙ্গে নতুন করে বেড়েছে এলপিজির দাম। এমন খবরও রয়েছে, বর্ধিত দামেও এলপিজি মিলছে না।

যে দামে সরকারকে এলএনজি আনতে হচ্ছে, তাতে এ খাতে রাখা ভর্তুকি নাকি তিন মাসেই শেষ। সেটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ এলএনজির দাম ইরান যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এখন আড়াই থেকে তিন গুণ। এলএনজি কেনা গেলেও কার্গো মিলছে না, পরিস্থিতি এমন। আর এটা আনতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দূরবর্তী উৎস থেকে। তাতে প্রতাপশালী দেশটির সঙ্গে ‘চুক্তির মর্যাদা’ রাখা যাচ্ছে অবশ্য!

সেখান থেকে গমসহ খাদ্যশস্যও আনা হচ্ছে বেশি দামে। আমদানি ব্যয় বেশি পড়লে দেশীয় বাজারে দামও পড়ে বেশি। সঙ্গে আছে আমদানি শুল্কের চাপ। তাতে অবশ্য সরকারের রাজস্ব বাড়ে। আয়কর আদায়ে তার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে মূল্যস্ফীতির চাপে পণ্যের চাহিদা কমে গেলে শুধু ব্যবসা কমবে না; আমদানিও কমে আসতে পারে। তখন শুল্ক খাত থেকে সরকারের আয়ও কমবে।
এ অবস্থায় ভালো হতো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি আপাতত স্থগিত রাখলে। কিংবা কেবল নিম্ন বেতনভুক্তদের বেতন বাড়ালে। বিরাট বেসরকারি খাতে তো এভাবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। সেখানে বরং চলছে কর্মচ্যুতি। বিনিয়োগে মন্থরতা। যুদ্ধের প্রভাবসহ নানা কারণে বিদেশি শ্রমবাজারও আমাদের প্রতি বিরূপ। কী হবে আমাদের!

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×