ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব খাদ্য দিবস

আজকের উদ্ভাবনেই নিশ্চিত হবে আগামীর পুষ্টি

আজকের উদ্ভাবনেই নিশ্চিত হবে আগামীর পুষ্টি
×
×

মো. আল-মামুন

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি। এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় দূরদর্শী বিনিয়োগের বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির সংকোচন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের টেকসই জোগান নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবনেই নিশ্চিত হবে আগামীর পুষ্টি’ কেবল উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান নয়; বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কার্যকর নীতির সমন্বয়ে এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়, যার সুফল পৌঁছাবে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি টন, যা বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি টনে উন্নীত। এ সময় জনসংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদনে এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে উন্নত জাতের বীজ, সেচ সম্প্রসারণ, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কৃষির সক্ষমতার পরিচায়ক।
তবে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করলেই পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের সুস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজন বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য এবং তা কেনার সামর্থ্য। ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতার পাশাপাশি পুষ্টিশিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও অপরিহার্য। বাজারে পুষ্টিকর খাদ্য থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকলে সেই প্রাপ্যতা অর্থবহ হয় না। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ন্যায্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে জাতীয় কৃষি ও খাদ্যনীতির অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষি এখন বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির মুখে। হাওর, উপকূল, চর ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষি-পরিস্থিতি এক নয়। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা এবং প্রতিকূলতা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন, রোগবালাই প্রতিরোধী, অধিক উৎপাদনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

জেনেটিক্স, জিনোমিক্স, মার্কার-সহায়ক নির্বাচন, জেনোমিক সিলেকশন, জিন এডিটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যনির্ভর কৃষি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণ, জাত উন্নয়নের সময় কমানো, রোগবালাইয়ের পূর্বাভাস এবং পানি ও সারের দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পরিবেশগত নিরাপত্তা, ব্যয়সাশ্রয়িতা ও কৃষকের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে। আধুনিক গবেষণার সঙ্গে স্থানীয় জাত, কৃষকের অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত জ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই উদ্ভাবন অধিক কার্যকর হবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ ভবিষ্যতের খাদ্য চাহিদা পূরণে উর্বর কৃষিজমি সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পানির দক্ষ ব্যবহার এবং ফসলের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। কৃষিজমির অপরিকল্পিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষিশিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে আধুনিক কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে তরুণদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। কৃষিকে শুধু প্রথাগত পেশা হিসেবে নয়, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তাভিত্তিক সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃষি গবেষণার সার্থকতা শুধু নতুন জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে কৃষকের মাঠে তার কার্যকর প্রয়োগের ওপর। একটি উদ্ভাবন কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় কতটা বাড়ায়, উৎপাদন ব্যয় ও ঝুঁকি কতটা কমায় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কী ভূমিকা রাখে তার ভিত্তিতে গবেষণার বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল তাৎপর্য হলো খাদ্য উৎপাদনের সাফল্যকে সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তায় রূপান্তর করা। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি, জলবায়ু-সহনশীল উদ্ভাবন, কৃষকের ন্যায্য অধিকার এবং কৃষি গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিবিজ্ঞানীদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার, গবেষক, কৃষক, উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ এবং গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। আজকের গবেষণা, উদ্ভাবন ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপই গড়ে তুলবে আগামীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার শক্ত ভিত্তি।

কৃষিবিদ ড. মো. আল-মামুন: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

আরও পড়ুন

×