ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অধিকার

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড এবং জবাবদিহির প্রশ্ন

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড এবং জবাবদিহির প্রশ্ন
×
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১৪

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মসজিদে ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বক্তব্য, দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি। গণমাধ্যমের খবর থেকে বিষয়টি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। গত ১৫ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এ ঘটনা অপরাধের প্রকৃতি, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা এবং প্রবাসে বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততার প্রয়োজনও তত বেশি। পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করা যেমন দায়িত্বশীল অবস্থান নয়; তেমনি অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া মৃত্যুদণ্ডকে ন্যায়সংগত বলারও অবকাশ নেই। বিশেষত, মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং শাস্তির আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

মৃত্যুদণ্ড এমন একটি শাস্তি, যা কার্যকর হয়ে গেলে ভুল সংশোধনের আর কোনো সুযোগ থাকে না। তাই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ, উপযুক্ত আইনি সহায়তা এবং আপিলের অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির ৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কঠোরভাবে সীমিত রাখা এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সৌদি আরব এই চুক্তির রাষ্ট্রপক্ষ নয়; তাই চুক্তিটির বাধ্যবাধকতা সরাসরি তার ওপর প্রযোজ্য– এমন দাবি করা সমীচীন হবে না। তবে জীবনের অধিকার, ন্যায়সংগত বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে এ ঘটনার প্রশ্নগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। উপরন্তু বাংলাদেশের মতো সৌদি আরবও কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত, যার ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ফলে কনস্যুলেটকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বিষয়ে অবহিত করা হয়নি– শুধু এ তথ্য অনুচ্ছেদটি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করার জন্য যথেষ্ট না হলেও আটক ব্যক্তিদের তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কিনা; তারা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কিনা এবং সে অনুরোধ যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়েছিল কিনা– এসব প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত দুই নাগরিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্তের বিবরণ, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আপিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কখন বিষয়টি জানতে পেরেছিল; বিচার চলাকালে কনস্যুলেটের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কিনা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইনি বা কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ ছিল কিনা, তাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে তার নিজস্ব উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতার বিবরণও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার অজুহাতে নাগরিকের জীবন ও অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো অনুত্তরিত থাকা উচিত নয়।

আমাদের অবস্থান কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; আমাদের অবস্থান ন্যায়বিচারের পক্ষে। সৌদি আরবের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান রেখেও বলা প্রয়োজন, কোনো রাষ্ট্রের আইনগত ক্ষমতা থাকলেই তার প্রতিটি প্রয়োগ স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। একইভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাঁর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব থেকেও বাংলাদেশ অব্যাহতি পেতে পারে না। কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই দেশে নিজের নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। 

দুই বাংলাদেশির জীবন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের মৃত্যুদণ্ড ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রবাসীদের শ্রম ও উপার্জনের সুফল গ্রহণ করা নয়; তাদের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করাও। বিদেশে অপরাধে অভিযুক্ত হলেও একজন নাগরিক ন্যায়বিচারের অধিকার হারান না। বরং মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে সেই অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কোনো অভিযোগই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না; কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতাই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন ও অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তাই প্রবাসে বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা আরও কার্যকর করা জরুরি। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে রাষ্ট্র কীভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবে এবং আইনি সহায়তার ধারাবাহিকতা কীভাবে নিশ্চিত করবে– সে বিষয়ে কার্যকর কূটনৈতিক প্রটোকল থাকা উচিত। এ ধরনের ব্যবস্থা কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের অংশ।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×