ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংসদ নির্বাচন: ঢাকা-১৪

ত্রিমুখী লড়াইয়ে ঘুরেফিরে ‘গুম’ নিয়ে আলোচনা

ত্রিমুখী লড়াইয়ে  ঘুরেফিরে ‘গুম’  নিয়ে আলোচনা
×

 অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন নিজে গুমের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আয়নাঘর থেকে ফিরেছেন। আরেকজনের ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন গুম হয়ে এখনও ফেরেননি। ভাই গুম হওয়ার পরই তিনি গুমের শিকার হওয়া পরিবারগুলো নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। এ সংগঠনের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী। আর যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাসেম আরমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি আয়নাঘর থেকে বের হন। এ আসনে তাই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে গুমের বিষয়টি। 

এ দুই প্রার্থীর বাইরে আরেকজন স্বতন্ত্র হিসেবে ফুটবল প্রতীকে লড়ছেন। তিনি দারুস সালাম থানা বিএনপির বহিষ্কৃত আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সম্প্রতি তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তিনি এ আসনেরই বিএনপির সাবেক এমপি এস এ খালেকের ছেলে। এই তিন প্রার্থীকে ঘিরেই ভোটের যত হিসাবনিকশ। আরও ৯ প্রার্থী থাকলেও তাদের নাম কেউ চায়ের আড্ডায় আনছেন না।

সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়ন ও বনগাঁও ইউনিয়ন, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, শাহআলী থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন। এ আসনের মধ্যেই পড়েছে শাহ আলী মাজার, গাবতলী বাস টার্মিনাল, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মিরপুর স্টেডিয়াম। গত মঙ্গলবার দিনভর এসব এলাকা ঘুরে এবং ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। 
এখানকার ভোটার চার লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৩২ হাজার ৬৬ জন পুরুষ, দুই লাখ ২৩ হাজার সাতজন নারী। চারজন আছেন তৃতীয় লিঙ্গের। 

তুলির আছে ইতিবাচক ইমেজ
ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন গুম হওয়ার পরই গুমের শিকার হওয়া পরিবার নিয়ে তুলি গড়ে তোলেন ‘মায়ের ডাক’। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মায়ের ডাকের বিভিন্ন কর্মসূচি দেশে-বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তুলি হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। অনুসারীরা বলছেন, এই আসনে প্রায় সোয়া দুই লাখ নারী ভোটার রয়েছেন। তিনি নারীর নীরব সমর্থন পেতে পারেন। এ ছাড়া প্রকৌশলী তুলি যোগ্যতার মানদণ্ডেও পিছিয়ে নেই। তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনাও নেই। এ ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তে বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানের শীষের বাইরে যেতে পারবেন না। 

বিএনপির বড় অংশ আড়ালে সাজুকে চাইছে
এলাকাবাসী জানান, এই আসনে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজুর বাবা একাধিকবার বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এক সময় সাজুর বড় ভাই সৈয়দ মহসীনও আওয়ামী লীগের তৎকালীন ডাকসাইটে নেতা ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করে এমপি হয়েছিলেন। তখন অবশ্য আসনের পরিধি ছিল আরও বড়। তারা স্থানীয়ও বটে। আওয়ামী লীগ আমলে দারুস সালাম থানা বিএনপির নির্যাতিত ও নিপীড়িত নেতাকর্মীর সঙ্গে ছিলেন সাজু। এস এ খালেকের নিষ্ক্রিয়তার পর থেকে স্থানীয় বিএনপিকে সাজুই আগলে রেখেছেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানান, দলীয়প্রধান তারেক রহমান তাঁকে ডেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেছিলেন। তবে দলের নেতাকর্মীর চাপে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেননি। অনেকটা জনদাবির কারণেই তিনি নির্বাচনী মাঠে আছেন। হয়তো দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে সাজুর পক্ষে প্রচারণায় নামতে পারছেন না। তবে আড়ালে তারা সাজুকে চাইছেন।  

ধানের শীষ-ফুটবলের প্রতিযোগিতা, সুবিধায় দাঁড়িপাল্লা
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাসেম আরমানেরও ব্যাপক প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে। অন্য দুই প্রার্থীর মতো আরমান নিজেও প্রতিদিন ভোটারের কাছে যাচ্ছেন। তাঁর প্রচারণার বহরও এ দুই প্রার্থীর চেয়ে একেবারে কম নয়। পৈতৃকভাবে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের বাসিন্দা হলেও ঢাকাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর ওপর চলা নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরছেন। একবার সুযোগ চাইছেন ভোটারের কাছে। 
এ ছাড়া জামায়াতের ভোটব্যাংকও আছে এই এলাকায়। পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি তাদের নারী কর্মীরাও ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে আবারও ফ্যাসিস্ট ফিরে আসতে পারে। 
অবশ্য সাধারণ ভোটারের একাংশ বলছেন, এখানে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হলে ধানের শীষ আর ফুটবলের প্রতিযোগিতার মধ্যে দাঁড়িপাল্লা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে।

আওয়ামী লীগের ভোট যাবে কোথায়
২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আসলামুল হক। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাজু। নির্বাচিত হওয়ার পর আসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের নানা অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালে আসলামুল হক মারা গেলে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আগা খান মিন্টু। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে জয়ী হন যুবলীগ নেতা মাইনুল হাসান খান নিখিল। এখানে আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। এই ভোটাররা কাকে বেছে নেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। 
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সরোজ হাওলাদার বলেন, এই আসনের ভোটের হিসাবটা বেশ জটিল। এটুকু ধারণা করা যায়, ত্রিমুখী লড়াই হবে। আওয়ামী লীগের ভোটাররা এ ক্ষেত্রে ‘ভূমিকা’ রাখতে পারেন। 

এলাকার সমস্যা অনেক
মিরপুর বেড়িবাঁধের ওপারে সাভারের দুটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা আছেন বড় বিপদে। এই আসনের ভোটার হলেও তাদের ঢাকায় ঢুকতে হয় আমিনবাজার ব্রিজ হয়ে। তুরাগ নদের ওপর কোনো সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ ভোগান্তিতে আছেন এলাকার মানুষ। এ ছাড়া আছে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। পানি, গ্যাস, ভাঙা রাস্তাঘাটের মতো নাগরিক ভোগান্তির সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছে ব্যাটারি রিকশার যন্ত্রণা। 

গত সোমবার নির্বাচনী প্রচারণাকালে সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, এ আসনের সবচেয়ে অবহেলিত জনপদ কাউন্দিয়া ও বনগাঁ। সঠিক পরিকল্পনা নিলেই এ অঞ্চলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। আমি নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারির এই এলাকায় কোনো স্থান হবে না। তারা হয় ভালো হয়ে যাবে, নয়তো এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে। আমি কী করতে পারব, সেই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই মানুষের সমর্থন চাই।

একই দিনে আহমেদ বিন কাসেম আরমান গণসংযোগকালে বলেন, এখানে আমি আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি। বাবার ফাঁসির কয়েক দিন আগে আমাকে গুম করা হয়। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ২৪ ঘণ্টা পর তারা আদালতে নেবে। কিন্তু ঘণ্টা পেরিয়ে দিন, দিন পেরিয়ে সপ্তাহ- মাস গড়াল। আট বছর আমাকে সেই অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছিল। নামাজ পড়ার সময়টুকুও সেখানে বলা হতো না। আমরা নির্বাচিত হলে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করব। 
মঙ্গলবার গণসংযোগকালে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু বলেন, আমি এই এলাকার ছেলে। এলাকাবাসীর সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তাদের দাবির কারণেই আমি নির্বাচনে আছি। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য হয়েছি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে। আমি আশাবাদী, আমার সক্ষমতা এবং পরিবারের অতীত ভূমিকা ও এলাকার প্রতি অবদানের কারণে জনগণ আমাকে বেছে নেবেন। 

আরও প্রার্থী যারা
এই আসনে অন্য প্রার্থীর মধ্যে আছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী (একতারা), সিপিবির রিয়াজ উদ্দিন (কাস্তে), জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন (হাতি), গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন (উদীয়মান সূর্য), এলডিপির মো. সোহেল রানা (ছাতা), এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (ঈগল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির নুরুল আমিন (তারা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ (হাতপাখা)।

 

আরও পড়ুন

×