আন্দোলনে নারীর আকাঙ্ক্ষা
দেশকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ
আনিকা তাহসিনা
আনিকা তাহসিনা
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৮ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | ১৮:১২
আমার আন্দোলনের যাত্রাপথ কিছুটা দীর্ঘ। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল আমার সেই যাত্রা, তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্রী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম, নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে যেই বৃহৎ আন্দোলন হয়েছিল সেখানে স্মারকলিপি পাঠ করেছিলাম। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর কর্মচারীদের আবাসিক টাওয়ারের মসজিদে হামলা হওয়ার পর ক্যাম্পাসে নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। পুরো ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আমি দলীয় রাজনীতি না করলেও ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বরাবরই কথা বলার চেষ্টা করেছি। তাই জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হওয়াটা ছিল আমার জন্য স্বাভাবিক। এখানে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল– ন্যায্য দাবি আদায়।
আমার ভেতর সাহস সঞ্চার করে ১৫ জুলাই। আমি এই সুদীর্ঘ পথে এত নির্মম হামলা কোনো আন্দোলনে দেখিনি। পরদিন আবু সাইদ শহীদ হলেন। এসব ঘটনা সরাসরি আমাকে মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে দাঁড় করিয়েছিল। আমি জানতাম এই রক্তের মূল্য তৎকালীন হাসিনা সরকার আর তার পুলিশ বাহিনীকে দিতে হবে। এরপর ১৭ তারিখ ক্যাম্পাসে মিডিয়ার আড়ালে চলেছে ভয়াবহ হামলা।
এর আগেই রোকেয়া হলে আমরা রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছি। হলে আমরা সবাই একসঙ্গে ছাত্রলীগ বিতাড়িত করেছি, রাজু ভাস্কর্যের উল্টো পাশে হলের সামনে বসে স্বৈরাচারী শক্তির চোখে চোখ রেখে ‘খুনি’ স্লোগান দিয়েছি।
১৮ তারিখের হত্যাযজ্ঞের পর বুঝেছিলাম আমাদের ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এই লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে। শাটডাউনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তালিকাভুক্ত রোকেয়া হলের মূল সমন্বয়ক হওয়ার কারণে আমাকে বারবার জায়গা বদলাতে হয়েছে। এ আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দিয়েছেন আমাদের দেশের মায়েরা, মেয়েরা, নারীরা। তারা মিছিলের সম্মুখ সারিতে ছিলেন, বুকে বুলেট নিয়েছেন, পুলিশের গাড়ির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, কারফিউ ভেঙে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এ বিজয় আমাদের সবার, দেশকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ হয়েছে, আগামী দিনের স্বৈরাচারকে আমাদের আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। আমার মতো অনেক নারীর জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। রাজনীতি ও সমাজ গঠনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আসেনি। নির্বাহী বলয় থেকে, অদৃশ্য শক্তি আমাদের টেনে ধরছে। আমরা জুলাই সনদ এখনও পাইনি। এত রক্তাক্ত ইতিহাসের পরও কিছু গোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসেনি। তাদের মধ্যে কেউ নারীদের অনলাইন-অফলাইনে হেয়প্রতিপন্ন করেন, আবার কেউ মৌলিক সংস্কারে বাধা দেন।
আমাদের সবার মনে রাখতে হবে, জনগণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, তারা অন্যায় দেখতে চায় না, তারা হঠকারিতা দেখতে চায় না, তারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেখতে চায় না। তারা চায় সততা ও দৃঢ়তা, জনগণকে আপন করে এক কাতারে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা।
লেখক: যুগ্ম সদস্য সচিব, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ
- বিষয় :
- দেশরক্ষা
- গণঅভ্যুত্থান