বহুরেখা যে ক্যানভাস কারও একার নয়
ব্রিটিশ কাউন্সিলের আর্টস প্রোগ্রাম ম্যানেজার ওয়াসেকা ওয়াহিদের সঙ্গে ইশরাত বিনতে রউফ
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটা ক্যানভাস আসলে কার? যিনি প্রথম তুলি ছোঁয়ালেন, শুধু তাঁর? নাকি যারা পরে এসে রং দিলেন, রেখা টানলেন, নতুন কিছু আঁকলেন, তাদেরও? গত ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ঢাকার আলোকিতে ‘উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ফেস্টিভ্যালে এ প্রশ্নের একটা জ্যান্ত উত্তর তৈরি হয়েছিল। তার নাম ‘বহুরেখা’।
২০১০ সালে লন্ডনের সাউথ ব্যাংক সেন্টারে জুড কেলির হাত ধরে যে উৎসবের শুরু, তা এখন ছড়িয়েছে নানা দেশে। ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল ও সাধনার আয়োজনে সেই উৎসবের উদ্বোধনী পর্বের অংশ ছিল ‘বহুরেখা’। শিল্পী ও কিউরেটর ইশরাত বিনতে রউফের পরিকল্পনায় এটি ছিল অংশগ্রহণমূলক নারীবাদী লাইভ আর্ট। সাধনার কর্ণধার, নৃত্যশিল্পী লুবনা মারিয়াম এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের আর্টস প্রোগ্রাম ম্যানেজার ওয়াসেকা ওয়াহিদের তুলির টানে কাজের শুরু। তারপর ক্যানভাস খুলে দেওয়া হয় সবার জন্য।
পাঁচ বছরের শিশু এসেছে; এসেছেন আশির কোঠার প্রবীণ। নারী, পুরুষ, জেন্ডার-বৈচিত্র্যময় মানুষ, দেশি-বিদেশি শিল্পী আর সাধারণ দর্শক মিলিয়ে ৬০ জনের বেশি হাত পড়েছে এক ক্যানভাসে। প্রবীণ শিল্পী বীরেন সোম এঁকেছেন নাকফুল পরা এক নারীর মুখ। তার পাশেই হয়তো কোনো শিশুর আঁকাবাঁকা একটা দাগ। দুটোই সমান জায়গা পেয়েছে। নাম বা বয়স কারও রেখাকে বড় করেনি, ছোটও করেনি।
কাজটার গোড়ায় ছিল কয়েকটা পুরোনো নারীবাদী প্রশ্ন। কার কথা শোনা হয়? কার উপস্থিতি চোখে পড়ে? নিজের মতো করে জায়গা নেওয়ার সুযোগ পায় কে? আর অনেকে মিলে কিছু গড়লে তার শেষ চেহারা ঠিক করার অধিকার থাকে কার হাতে?
ইশরাত উত্তরটা কথায় দেননি, দিয়েছেন কাজে। নিজের আঁকা ছবির ওপর অন্যদের আঁকতে দিয়েছেন। বদলাতে দিয়েছেন। চাইলে পুরো অংশ ঢেকে দিতেও দিয়েছেন।
সময় গড়ায়, ক্যানভাসে গল্প জমে। কেউ আঁকেন একটা চোখ, কেউ গোটা একটা অবয়ব। কেউ আনেন প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের কথা, কেউ সমতা আর স্বাধীনতার কথা। একজন এক নারীর ঠোঁটের রং টেনে ছড়িয়ে দেন মুখজুড়ে। দেখে মনে হয় সহিংসতার দাগ। আরেকজন মেডুসার মাথায় জুড়ে দেন আরও কয়েকটা সাপ; তাতে তার রাগ আরও ধারালো হয়। কেউ সূর্য, কেউ চাঁদ, কেউ একটা ফুল রেখে যান।
এই ভিড়ের মধ্যে ইশরাতের চোখে পড়ে ছোট একটা ব্যাপার। তিনি জানান, শুরুতে অনেক নারী ও কিশোরী তুলিতে রং নিচ্ছিলেন খুব অল্প। কাজ করছিলেন ক্যানভাসের ছোট্ট এক কোণে। অথচ কয়েকজন পুরুষ বেশি রং নিয়ে বড় জায়গাজুড়ে আঁকছিলেন অনায়াসে।
ক্যানভাসে শুরু থেকেই ছিলেন নানা দেশ ও কালের কয়েকজন নারী। গ্রিক পুরাণের মেডুসাকে শত শত বছর দানব বলেই দেখানো হয়েছে। ১৯৭৫ সালে ফরাসি লেখক এলেন সিক্সু তাঁকে নতুন করে পড়েন দমিয়ে রাখা নারীর ক্রোধ আর হাসির প্রতীক হিসেবে। এখানেও তার রাগ প্রতিরোধের শক্তি। ছিল বাংলার মাটির টেপা পুতুল। ছিলেন কেনিয়ার ওয়াঙ্গারি মাথাই। গ্রিন বেল্ট আন্দোলনে কোটি কোটি গাছ লাগিয়ে যিনি ২০০৪ সালে প্রথম আফ্রিকান নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পান। ছিলেন ফ্রিদা কাহলো। শৈশবে পোলিও, কৈশোরে বাস দুর্ঘটনা। ভাঙা শরীর নিয়েও যিনি নিজের মুখকেই ছবির কেন্দ্রে রেখেছেন।
অংশগ্রহণকারীরা তাদের গায়ে হাত দিতে থাকেন। কারও কপালে ওঠে লাল টিপ, কারও গায়ে সিঁদুরের মতো চিহ্ন, কোথাও দক্ষিণ এশিয়ার চেনা রং। দূর দেশের চরিত্রগুলো এভাবে পেয়ে যায় একটা স্থানীয় ঠিকানা। বৈশ্বিক নারীবাদের ক্যানভাসে জায়গা করে নেয় দক্ষিণ এশীয় নারীর অভিজ্ঞতা। এ অঞ্চলে নারীর জীবন কেবল লিঙ্গ দিয়ে মাপা যায় না। পরিবারের প্রত্যাশা, শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম, জাতিসত্তা আর ঔপনিবেশিক ইতিহাস সব মিলেমিশে সেই জীবন গড়ে ওঠে।
ইশরাত নিজেও একটা চিহ্ন রেখে যান, নিজের শরীর থেকে। লাইভ আর্ট চলার মধ্যে কপালের টিপ খুলে বসিয়ে দেন টেপা পুতুলের কপালে। নারীর শরীর, পোশাক, সংস্কৃতি আর পছন্দ নিয়ন্ত্রণের যে পুরুষতান্ত্রিক চেষ্টা, তার বিরুদ্ধে এ ছিল এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ।
- বিষয় :
- ক্যানভা