তিন তরুণীর ধাক্কায় খুলেছিল যে দরজা
খালেদা শাহরিয়ার কবির, শিরীন সুলতানা এবং মনোয়ারা বেগম
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৬৪ সালের জানুয়ারি। ঢাকার গা থেকে শীত তখনও নামেনি। তিন তরুণী ঠিক করলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন। প্রতিষ্ঠানের নাম তখন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, একাত্তরের পর যার নাম হয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বা বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; যাকে সংক্ষেপে বলা হয় বুয়েট।
খালেদা শাহরিয়ার কবির, ডাকনাম ডোরা। শিরীন সুলতানা, ডাকনাম চুমকি এবং মনোয়ারা বেগম। ডোরা ও চুমকির পরিচয় ইডেন কলেজে। হলি ক্রসের ছাত্রী মনোয়ারা খবর পেয়ে নিজে দুজনকে খুঁজে নেন। সমস্যা ছিল একটাই। বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েদের ভর্তি করাতে রাজি নয়।
প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক এমএ রশীদ নারীশিক্ষার্থী ভর্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন। কর্তৃপক্ষের ভয়, রক্ষণশীল সমাজ চড়াও হবে। তাই মেয়েদের দূরে রাখাই নিরাপদ।
তিন তরুণী নিরাপত্তা চাননি। চেয়েছিলেন খাতা-কলম। ডোরা প্রশাসনকে সোজা প্রশ্ন করেন, কোথাও কি লেখা আছে মেয়েরা এখানে পড়তে পারবে না? থাকলে দেখান। না থাকলে ভর্তি পরীক্ষায় বসতে দিন।
প্রশাসন গোঁ ধরল, মেয়েরাও। শেষে উপাচার্য হার মানলেন। তবে শর্ত জুড়লেন, পুরকৌশল বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যাবে না। ওতে মাঠে নামতে হয়, রোদে দাঁড়িয়ে জমি মাপতে হয়। অথচ ডোরার স্বপ্ন ছিল ওটাই। তাঁর বাবা কবির উদ্দিন আহ্ছানউল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পুরকৌশল পড়াতেন।
দ্বিতীয় বর্ষে বিভাগ বাছার সময় ডোরা আর চুমকি বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক্যাল নিলেন। তারপর আবার গেলেন উপাচার্যের ঘরে। এবার যুক্তি এলো, সাভারে এক মাস থেকে জরিপ করতে হবে, পরিবার কি রাজি হবে? দুজন জানালেন, পরিবার বিনা বাক্যে রাজি। উপাচার্যের হাতে আর যুক্তি রইল না। ডোরা ও চুমকি গেলেন পুরকৌশলে, মনোয়ারা রসায়ন কৌশলে। স্থাপত্য বিভাগে মেয়েরা আগে থেকেই পড়তেন। কিন্তু প্রকৌশলের দরজাটা খুলল এই তিনজনের হাতে।
ভর্তির পরের দিনগুলোও সহজ ছিল না। ক্লাসরুমের জানালায় লোক ভিড় করত তাদের দেখতে। রাস্তায় অচেনা মানুষ থামিয়ে কথা বলতে চাইত। ডোরা বলতেন, এ বাড়তি মনোযোগে পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যে প্রতিষ্ঠান মেয়ে নিতে চায়নি, সেখানে মেয়েদের মাথা গোঁজার জায়গাটুকুও ছিল না। মনোয়ারা ও চুমকিকে থাকতে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে। তবু ডোরা সেই দিনগুলোর কথা বলতেন মমতা নিয়ে। র্যাগিং ছিল না, উত্ত্যক্ত করা ছিল না। রাতে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন, একদিনও অনিরাপদ মনে হয়নি।
ডোরা ও চুমকি স্নাতক হন ১৯৬৮ সালে, মনোয়ারা ১৯৭০ সালে। ডোরা পানি উন্নয়ন বোর্ডে ৩৪ বছর কাজ করে অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে অবসর নেন। মারা যান ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি। চুমকি দুই বছর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে কাজ করে বিয়ের পর বিদেশে চলে যান। পরে থিতু হন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। মনোয়ারা ৩২ বছর কাজ করেছেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে। পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানের সময় তাঁর স্বামী নিখোঁজ হন। মনোয়ারা মারা যান ২০০২ সালে।
কয়েক বছর আগে সামাজিক মাধ্যমে তাদের একটি পুরোনো ছবি ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে গল্প, তারা নাকি মামলা করে জিতে বুয়েটে ঢুকেছিলেন। ডোরা বেঁচে থাকতেই তা নাকচ করে গেছেন। মামলা হয়নি। তারা যুক্তি দিয়ে কথা বলে সিদ্ধান্ত বদলে ছিলেন।
নারীর লড়াই আমরা মনে রাখি ভুল করে। বানানো গল্পটা নাটকীয়, তাই সেটি অধিক পরিচিত। আসল লড়াইটা ছিল ধৈর্য, যুক্তি আর জেদের।
ভুলে যাওয়ার এই অভ্যাস পুরোনো। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তের নাম পাঠ্যবইয়ে এক লাইনে সারা হয়। নাচোলে ইলা মিত্রের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বিবরণ আমরা পড়তে চাই না। বায়ান্নর ছাত্রীদের কথা ওঠে শুধু ফেব্রুয়ারিতে। একাত্তরে তারামন বিবি, কাঁকন বিবি অস্ত্র ধরেছেন। সিতারা বেগম সামলেছেন যুদ্ধের হাসপাতাল। নাম না জানা হাজারো নারী ভাত রেঁধেছেন, ক্ষত ধুয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে রেখেছেন। যুদ্ধ শেষে তাদের ভাগে জুটেছে নীরবতা। বীরাঙ্গনা শব্দটাকে সম্মান বানাতে গিয়ে আমরা অপবাদ বানিয়ে ফেলেছি।
কাছের ইতিহাসও তা-ই। পোশাক কারখানার মজুরি আন্দোলনে সামনের সারিতে নারী। চা-বাগানের ৩০০ টাকা মজুরির লড়াইয়ে পাতা তোলা হাত রাস্তায় নেমেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মেয়েরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়েছিলেন। সেই ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়েছে উত্তাপ নেভার আগেই।
বিমল মিত্রের একটি বইয়ের নাম ‘যা ইতিহাসে নেই’। নামটাই আমাদের ইতিহাসচর্চার বড় সমালোচনা। ইতিহাস কারা লেখেন, এ প্রশ্নেই গলদটা ধরা পড়ে। লেখেন মূলত পুরুষরা, নিজের গোষ্ঠী আর শ্রেণির চোখ দিয়ে। তাই ইতিহাসচর্চাকে শিকড়ে ফিরতে হবে। যে হাতে ধান বোনা হয়, সেলাই মেশিন চলে, দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলা হয়, সেই হাতের ঘামেই দেশটা দাঁড়িয়ে আছে।
নারীর অবদান কম নয়। কম শুধু স্বীকৃতি। সমাজ তা দিতে চায় না, রাষ্ট্রও না। তাই রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের দাবি যথেষ্ট নয়। দরকার নেতৃত্ব, নিজের অবস্থান শক্ত করা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এ প্রশ্ন বারবার ওঠে, দু-পা এগোয়, আবার পিছিয়ে যায়।
ষাটের দশকে তিন তরুণী যে দরজায় ধাক্কা দিয়েছিলেন, তা আজও পুরোপুরি খোলেনি। পরীক্ষার হলে বসতে দেওয়া হবে কিনা, সে প্রশ্ন এখন নেই। এখন প্রশ্ন, ইতিহাসের পাতায় নাম উঠবে কিনা। আজ বুয়েটের ল্যাবে যে মেয়েটি বসে আছে, জানুক বা না জানুক– সে ওই ধাক্কার উত্তরাধিকারী।
- বিষয় :
- লাবণী মণ্ডল
- বুয়েট
- নারীশিক্ষা