আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস
কন্যাশিশুর নিরাপদ জায়গা কোথায়
ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে
রতন মালো
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:১৪
মেয়েকে নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তা এ দেশে নতুন কিছু নয়। স্কুলের পথ, অচেনা মানুষ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ নিয়ে ভয় অনেকদিনের। সেই পুরোনো তালিকায় এখন যোগ হয়েছে সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন প্রতারণা, যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, পাচার আর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। ভয়টা আর শুধু গরিব ঘরের নয়। মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের মেয়েরাও এখন একই ঝুঁকিতে।
১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। সরকার জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করবে ১২ অক্টোবর। দিবসের আগে হিসাবের খাতাটা একবার খুলে দেখা দরকার।
সংখ্যা যা বলছে
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পত্রিকার খবর ধরে প্রতিবছর সহিংসতার হিসাব রাখে। ২০২৫ সালে সংগঠনটি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। তাদের ৫৪৩ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের প্রায় সাতজনই শিশু। একই বছরে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৪২টি, ধর্ষণচেষ্টা ১১৭টি, আত্মহত্যা ২০৩টি।
চলতি বছরের ছবিটা আরও খারাপ। জানুয়ারি থেকে আগস্ট– এই আট মাসে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা এক হাজার ৯১৯টি। এর ৮৮৪টিতে ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। ধর্ষণের ৩৩১ ঘটনার ২৪০টিতেই শিকার শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার ৩৩টি ঘটনার ২২টিতে এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৩৬ ঘটনার ১১২টিতেও তাই। মনে রাখা দরকার, এগুলো কেবল পত্রিকায় ছাপা হওয়া ঘটনা। যে ঘটনা থানায় যায়নি, খবরে আসেনি, তার হিসাব কারও কাছে নেই।
চেনা জায়গায় অচেনা বিপদ
সংকটের সবচেয়ে ভয়ের দিকটা অন্যখানে। যে জায়গাগুলোকে আমরা শিশুর জন্য নিরাপদ বলে ধরে নিই, সেগুলোও আর নিরাপদ নয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মার্চে কন্যাশিশুর ওপর যৌন সহিংসতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সংস্থাটি আবার একই কথা বলেছে। তাদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-প্রতিবেশী, সেবাকেন্দ্র, সবখানেই সুরক্ষা ও জবাবদিহি শক্ত করতে হবে। বিপদ শুধু রাস্তায় বা অচেনা লোকের কাছে নয়। চেনা মানুষ, চেনা সম্পর্কের ভেতরেও বিপদ থাকে।
পাচারের চিত্রও ভালো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানব পাচারবিষয়ক (টিআইপি) প্রতিবেদন ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা তিন বছর বলেছে, বাংলাদেশে শিশু যৌন পাচার এখনও ব্যাপক। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন শোষণের শিকার। পাচারকারীরা চাকরি বা আয়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাদের টেনে নেয়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে: দারিদ্র্য, জলবায়ুর কারণে ঘরছাড়া হওয়া, বাল্যবিবাহ, সামাজিক বৈষম্য আর দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা।
হাতের ফোনে খোলা দরজা
ইউনিসেফ ২০২৫ সালে ১১ বছরের এক মেয়ের ঘটনা সামনে এনেছিল। সামাজিক মাধ্যমে এক প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সঙ্গে যোগাযোগের পর সে নিখোঁজ হয়। পরে তাকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে পাওয়া যায়।
এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের চারটি স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণির ৪৫৬ শিক্ষার্থীর ওপর করা এক গবেষণায় ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছে, তারা জীবনের কোনো সময়ে অন্তত এক ধরনের অনলাইন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে। এখানেই মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের উদ্বেগ। দামি ফোন আর ভালো স্কুল মেয়েকে আগলে রাখছে না। উল্টো তার ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। গ্রুমিং, স্টকিং, সেক্সটিং এখন অনেক অভিভাবকের অজানা শব্দ, অথচ সন্তানের রোজকার বাস্তবতা।
ইউনিসেফের ২০২৫ সালের যুব জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণের দুই-তৃতীয়াংশ বলেছে, অনলাইনের ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য তাদের মানসিক চাপে ফেলেছে।
সমস্যাটা বাংলাদেশের একার নয়। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফের গবেষণায় ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতি পাঁচ শিশুর একজন এক বছরের মধ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। সংখ্যায় তা প্রায় দুই কোটি। সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বে প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবে যৌন সহিংসতার মুখে পড়েছেন। তাদের ৩৭ কোটির বেশি ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার।
আইন আছে, ভরসা নেই
আইনের দিক থেকে দেশ পিছিয়ে নেই। চলতি বছর মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে নতুন আইন হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি এবং অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়ানোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনের পাতা আর মেয়ের জীবনের মাঝখানে ফাঁক রয়ে গেছে। সেই ফাঁক গলেই অপরাধীরা বেরিয়ে যাচ্ছে। বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হলে নতুন আইন কেবল তালিকাই লম্বা করবে।
তাহলে দায়িত্বটা কার? সরকারের, পুলিশের, অভিভাবকের, নাকি প্রতিবেশীর? উত্তর হলো, সবার। তবে মেয়েকে ঘরে আটকে রাখা কোনো সুরক্ষা নয়। তাকে নির্ভয়ে কথা বলার জায়গা দিতে হবে। অনলাইন ও অফলাইনের বিপদ চিনতে শেখাতে হবে। বিপদে পড়লে দোষ না খুঁজে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা মানে শুধু একটি অপরাধ ঠেকানো নয়। তার চলাফেরা, পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ– সবকিছুর জন্য এমন পরিবেশ চাই, যেখানে সে ভয় নিয়ে নয়, আস্থা নিয়ে বড় হবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী