সম্পর্ক ছিন্ন করার নোটিশই শেষ কথা নয়
জাকিয়া সুলতানা ইমি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বিবাহবিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। বিচ্ছেদের এই ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নারীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প। বিশেষ করে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের নোটিশ আসার পর একজন নারী যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হন, তার অনেকটাই ঘটে আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাবে।
আমাদের সমাজে তালাককে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত ও ক্ষতিকর ভ্রান্ত ধারণাটি হলো–এক টুকরো কাগজে তালাকনামা বা নোটিশ পাঠিয়ে দিলেই স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সব দায়িত্বের তাৎক্ষণিক অবসান ঘটে। বাস্তবে দেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামী শরিয়াহ–উভয় ক্ষেত্রেই এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। তালাকের নোটিশ পাঠানোর পরও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বেশ কিছু অলঙ্ঘনীয় আইনি ও কাঠামোগত দায়িত্ব বহাল থাকে। এ দায়িত্বগুলোর মধ্যে ‘ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ’ বা খোরপোশ অন্যতম, যা নিয়ে অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং পরিবারগুলো জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ে।
সাধারণত ডাকযোগে বা বাহকের মাধ্যমে তালাকের নোটিশ হাতে পাওয়ার পর একজন নারী প্রথমেই গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে–‘তালাক কার্যকর হতে তো আইনত তিন মাস সময় লাগবে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে আমি কোথায় থাকব? আমার দৈনন্দিন খরচ, চিকিৎসাব্যয় কে বহন করবে?’
অন্যদিকে অনেক স্বামী বা তাঁর পরিবার মনে করেন, যেহেতু তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়ে গেছে, তাই স্ত্রীকে আর এক পয়সাও দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই ভুল বোঝাবুঝির কারণে স্ত্রী বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি বা অন্য কোথাও আশ্রয় নেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করেন। অথচ আইনের চোখে এ সময়েও তিনি ওই ব্যক্তির বৈধ স্ত্রী।
বাংলাদেশের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো স্বামী তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং এর একটি অনুলিপি স্ত্রীকে পাঠাতে হবে। এই নোটিশ দেওয়ার পর থেকে তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়া পর্যন্ত সময়কে ‘ইদ্দতকাল’ বলা হয়।
সাধারণত এই সময়কাল ৯০ দিন। তবে স্ত্রী যদি নোটিশ পাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা থাকেন, তবে সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত ইদ্দতকাল অব্যাহত থাকবে। এই ৯০ দিন সময় দেওয়ার মূল আইনি ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য কেবল অপেক্ষা নয়; বরং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে সালিশি পরিষদ গঠন করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে পুনর্মিলনের একটি শেষ সুযোগ তৈরি করা। একইসঙ্গে এ সময়ে নারীর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
যেহেতু নোটিশ দেওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদ আইনত কার্যকর হয় না, তাই এ পুরো ইদ্দতকালে স্ত্রীর যাবতীয় ভরণপোষণ দেওয়া স্বামীর জন্য একটি অবশ্য পালনীয় আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এই ভরণপোষণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্ত্রীর প্রয়োজনীয় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা।
অনেকে মনে করেন, তালাকের নোটিশ পেয়ে স্ত্রী রাগ করে বাবার বাড়ি চলে গেলে তাঁকে আর খোরপোশ দিতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। স্ত্রী স্বামীর বাড়িতে থাকুন বা বাবার বাড়িতে– বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে ছিন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বামী কোনোভাবেই তাঁর খোরপোশ দেওয়ার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান না।
আইনে খোরপোশের নির্দিষ্ট কোনো টাকার অঙ্ক বেঁধে দেওয়া নেই। এটি সম্পূর্ণ পরিস্থিতিনির্ভর। সাধারণত স্বামীর মাসিক আয়, তাঁর সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান, জীবনযাত্রার মান এবং স্ত্রীর যুক্তিসংগত প্রয়োজন বিবেচনা করে এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এই অঙ্ক নির্ধারণ করতে পারেন। তবে স্বামী যদি স্বেচ্ছায় ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানান বা তাদের মধ্যে সমঝোতা না হয়, তবে স্ত্রী ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫’-এর অধীনে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ন্যায্য ভরণপোষণের আদেশ দিয়ে থাকেন।
এটি মনে রাখা জরুরি, ৯০ দিন বা ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটলে স্ত্রীর জন্য নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা স্বামীর আর থাকে না। এখানেই সব শেষ নয়।
বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (যা আগে পরিশোধ করা হয়নি) পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক। দেনমোহর স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার এবং স্বামীর কাছে এটি একটি আইনি ঋণ। এ ছাড়া দম্পতির যদি সন্তান থাকে, তবে তালাক হলেও সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ আইনি দায়িত্ব বাবার ওপর বর্তায়। আইনের দৃষ্টিতে তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হলেও, পিতা-সন্তানের সম্পর্ক কখনোই ছিন্ন হয় না।
তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, যন্ত্রণাদায়ক এবং সুনির্দিষ্ট আইন-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। আবেগ, ক্ষোভ বা সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। বিশেষ করে নারীদের নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া সময়ের দাবি।
মনে রাখতে হবে, একটি নোটিশেই সব দায়িত্বের ইতি ঘটে না। ইদ্দতকালীন খোরপোশ, প্রাপ্য দেনমোহর এবং সন্তানের অধিকার–এগুলো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন দ্বারা স্বীকৃত ও সুরক্ষিত নারীর অধিকার। পারস্পরিক সম্মানবোধ, সচেতনতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেই কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক বিরোধ ও আদালতের দীর্ঘসূত্রতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
লেখক: আইনজীবী
- বিষয় :
- সম্পর্ক