জলবায়ু ঝুঁকি, কপ-৩১ এবং আগাম প্রস্তুতি
ছবি:: মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন
এম এম মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
২৬ আগস্ট। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রসুয়া জেলা। লাংতাং লিরুং পর্বতের গা থেকে হিমবাহের বড় একটা অংশ খসে পড়ল। প্রায় এক হাজার ২০০ মিটার গড়িয়ে নেমে আটকে দিল ভোতেকোশি নদী। সেই প্রাকৃতিক বাঁধ টেকেনি বেশিক্ষণ। ভাঙতেই নিচের জনপদে নামল পানি, কাদা আর পাথরের ঢল। মাসখানেক পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ ক্ষতির হিসাব দিলেন। মারা গেছেন অন্তত এক হাজার ৪৫০ জন। ভেসে গেছে সড়ক, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, মানুষের রুটিরুজি। তাঁর দাবি–পুনর্গঠনে ঋণ নয়, অনুদান চাই। অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলের হিসাবে নতুন করে দাঁড়াতে লাগবে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর লেগেছিল প্রায় ৯০০ কোটি। বিশ্বব্যাংক জরুরি ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ডলারের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশ দিয়েছে ১০ লাখ ডলার অনুদান। দরকার আর পাওয়ার মাঝখানের এ ফাঁকটাই আসল কথা।
ব্যাংকে কাজ করা ও উন্নয়ন গবেষণার অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি, দুর্যোগের সবচেয়ে কম আলোচিত দিক হলো টাকার দিক। ক্ষতি আসে তিন ধাপে। প্রথমে চোখে পড়ে ভাঙা অবকাঠামো। তারপর থমকে যায় উৎপাদন, ব্যবসা, কাজ। সবশেষে আসে পুনর্গঠনের ঋণ, যা বছরের পর বছর বাজেটের ঘাড়ে চেপে বসে থাকে। একটা সেতু ভাঙলে শুধু ইট-রডের দাম হারায় না। কৃষকের ধান হাটে ওঠে না, শ্রমিক কারখানায় পৌঁছায় না। এক ক্ষতি টেনে আনে আরেক ক্ষতি। বাংলাদেশ নেপাল নয় কিন্তু এ আর্থিক ধাক্কার জায়গায় দুই দেশের মিল বিস্তর। নিচু বদ্বীপ, লম্বা উপকূল, ঘনবসতি। জলবায়ু ঝুঁকির তালিকায় তাই বাংলাদেশ ওপরের দিকে। একটা বড় বন্যা জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত নামিয়ে দিতে পারে। পুরোনো ক্ষতও একই সাক্ষ্য দেয়। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি দেড় বিলিয়ন ডলার। ২০০৭ সালের সিডরে প্রায় পৌনে দুই বিলিয়ন; যার বড় অংশ ঘরবাড়ি আর উৎপাদন খাতে। প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামের পাহাড়ে মাটি সরে, সঙ্গে সরে মানুষের ঘর।
দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে ঢাকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। তাদের জলবায়ু ঋণঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ পড়েছে ‘উচ্চঝুঁকির ঋণফাঁদ’ শ্রেণিতে। ২০০২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত অভিযোজনে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার, প্রয়োজনের এক শতাংশও নয়। অভিযোজনের টাকা যদি অনুদান না হয়ে ঋণ হয়ে আসে, তবে প্রকৃতির আঘাতের ওপর চাপবে কিস্তির বোঝা। যে দেশ দূষণ করেনি, সে-ই সুদ গুনবে। সরকার চলতি অর্থবছরে ২৫ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু বরাদ্দ প্রায় ২৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। তা এখন মোট বাজেটের ১১ শতাংশের বেশি। খবরটা ভালো। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এ টাকার কতটা যাচ্ছে আগাম প্রস্তুতিতে আর কতটা কেবল ভাঙা জিনিস জোড়া দিতে।
প্রথম কাজ একটা জাতীয় ক্ষয়ক্ষতির তথ্যভান্ডার। প্রতিটি বড় দুর্যোগে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ক্ষতি, আয় আর কাজ হারানোর হিসাব, রাজস্বের চাপ, সব থাকবে আন্তর্জাতিক মানে নথিভুক্ত। দরকষাকষির টেবিলে আবেগ টেকে না, টেকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য।
দ্বিতীয়ত, প্যারামেট্রিক বীমা। বৃষ্টি, বাতাসের গতি বা পানির উচ্চতা নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়ালেই আগে থেকে ঠিক করা টাকা দ্রুত পৌঁছে যাবে ক্ষতিগ্রস্তের হাতে। কৃষক, ছোট দোকানি, দিনমজুর পরিবারকে তখন আর ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে হবে না। আঞ্চলিক পুনর্বীমা আর বিপর্যয় বন্ডের পথও খুঁজে দেখা দরকার।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের বিদেশি ঋণচুক্তিতে দুর্যোগ ধারা রাখা। বড় বিপর্যয়ের পর কিছুদিন কিস্তি স্থগিত থাকলে সীমিত টাকাটা মানুষ বাঁচানো আর অভিযোজনে খরচ করা যায়। নরওয়ের সহায়তায় ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়নে সক্ষমতা বাড়ানোর যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, সেটি ভালো সূচনা। তবে তথ্য, প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন আর কূটনীতিকে এক সুতোয় গাঁথতে হবে।
কপ-৩১: আমাদের দাবি
৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় বসছে কপ-৩১। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কারিগরি সমন্বয় কমিটি আর তিনটি উপকমিটি করেছে; পজিশন পেপারের খসড়াও চূড়ান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের যৌথ অবস্থান নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। হিমালয়ের বরফ আর বদ্বীপের পানি যে একই সুতোয় বাঁধা, নেপালের এই দুর্যোগ তা আবার দেখিয়ে দিল। শ্রমিক সংগঠনগুলোও চাইছে, অবস্থানপত্রে শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা জায়গা পাক।
এবারের সম্মেলনকে বলা হচ্ছে ‘বাস্তবায়নের কপ’। নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে পুরোনো কথা রাখার হিসাবই হবে মুখ্য। তাই শুধু অভিযোগ আর আবেদন নিয়ে গেলে চলবে না। সঙ্গে নিতে হবে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের তালিকা: সৌরবিদ্যুৎ, কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল, আধুনিক সঞ্চালন গ্রিড, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, সবুজ শিল্প। জলবায়ু কূটনীতি আসলে বিনিয়োগের কূটনীতিও।
নেপালের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি নিজেদের দিকেও তাকানো দরকার। হিমবাহ থামানো যাবে না। কিন্তু তার ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি শুরু করতে হবে আজই; পরের বিপর্যয়ের আগে। v
লেখক: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক
- বিষয় :
- জলবায়ু পরিবর্তন