শিক্ষায় এগিয়ে, ক্ষমতায়নে পিছিয়ে
ছবি:: আজকিন
বাসন্তি সাহা
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পরীক্ষায় মেয়েরা ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ সংসদে, প্রশাসনে আর কাজের বাজারে তারা এখনও পেছনের সারিতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বলছে, নারী-পুরুষ সমতার সূচকে বাংলাদেশ এক বছরে ২৪তম থেকে নেমে ৭৯তম হয়েছে। শিক্ষা আর স্বাস্থ্যে ভালো নম্বর পাওয়ার পরও নারীর এগিয়ে চলা কোথায় থেমে যাচ্ছে, সেটিই খুঁজে দেখা হয়েছে এ লেখায়...
এ বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ছাত্রদের চেয়ে ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি ছাত্রী বসেছিল। পাসের হারেও মেয়েরা এগিয়ে। অথচ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ আসনে সরাসরি ভোটে জিতে এসেছেন মাত্র সাতজন নারী। এই দুই সংখ্যার মাঝখানে যে ফাঁক, সেখানেই হারিয়ে যাচ্ছে এ দেশের মেয়েদের শ্রম, মেধা আর সম্ভাবনা।
ফাঁকটা এবার মেপে দেখিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বলছে, নারী-পুরুষ সমতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ এক বছরে ৫৫ ধাপ পিছিয়েছে। গত বছর অবস্থান ছিল ২৪তম, এবার ৭৯তম। সার্বিক স্কোর ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নেমে হয়েছে ৭১ দশমিক ২। প্রতিবেদনে একে বিশ্বের অন্যতম বড় পতন বলা হয়েছে।
চারটি মানদণ্ডে এই সূচক তৈরি হয়: রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য। শিক্ষায় বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ, এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্যেও ৯৬। ধস নেমেছে বাকি দুই জায়গায়। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের সূচকে বাংলাদেশ এখন ১৩৯তম। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ১৪৫ দেশের মধ্যে ১৪২তম। শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় ৮০ শতাংশ, নারীর ৩৮ শতাংশের কিছু বেশি।
পুরোনো ক্ষত, নতুন হিসাব
জেন্ডার বিশ্লেষক ফারহানা হাফিজ এই পতনকে আকস্মিক মনে করেন না। তাঁর মতে, কভিডের পর থেকেই শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। যেটুকু আছে, তা-ও নিচের ধাপে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনার পদে নারী প্রায় চোখেই পড়ে না। মজুরিতেও বৈষম্য রয়ে গেছে। আগের বছরগুলোয় সূচকে বাংলাদেশকে টেনে তুলেছিল রাজনীতির ঘর। দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকার ছিলেন নারী। সেই হিসাব সরে যেতেই ভেতরের দুর্বলতা বেরিয়ে পড়েছে।
আইএলওর তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি জানান, কর্মজীবী নারীর ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ করেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ক্ষেতে-খামারে, অন্যের রান্নাঘরে, দিনমজুরিতে, হস্তশিল্পের ছোট উদ্যোগে। সেখানে ন্যূনতম মজুরি নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই। অনেক কাজের কোনো দামই ধরা হয় না। ঘাম ঝরে, হিসাবের খাতায় ওঠে না।
প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খোন্দকার ইভাও বলেন, এই অবনমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত বৈষম্য একসঙ্গে জমে এ চেহারা নিয়েছে। পোশাক খাতে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমছে। দলগুলো নারীকে মনোনয়ন দিতে আগ্রহী নয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নিবন্ধিত দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। মানার তাগিদ নেই। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ১৫টি বিষয়ে চার শতাধিক সুপারিশ দিয়েছিল। তার মধ্যে স্বাধীন ও স্থায়ী নারী কমিশন গঠনের প্রস্তাবও ছিল। বাস্তবায়নের উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
প্রশাসনের ছবিও আলাদা নয়। সরকারি কর্মকর্তা কাজী মাসুদা সুলতানা মুন্নী জানান, ৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে নারী ২১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ৪৪তম বিসিএসে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮০ জন নারী আবেদন করেছিলেন। ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন ৩৩৮ জন, মোটের ২০ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রতি পাঁচজন ক্যাডারের চারজনই পুরুষ।

ভালো নম্বরের আড়ালে
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ভালো নম্বরও পুরো কথা বলে না। ধামরাই সরকারি কলেজের অধ্যাপক ড. ওয়াদুদ আলিম জানান, প্রাথমিকে ভর্তি ও সমাপনীর হার ছেলেমেয়ের প্রায় সমান। মাধ্যমিকে এসে বাল্যবিবাহ মেয়েদের ঝরিয়ে দেয়। যারা টিকে যায়, তারা ফলাফলে ছেলেদের ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু পড়া শেষ করে কাজে ঢোকার সময় আবার পিছিয়ে পড়ে। বিয়ের পর অনেক পরিবার চাকরি করতে দেয় না। পথেঘাটে নিরাপত্তাহীনতা আর প্রতিদিনের নির্যাতনের খবর মেয়েদের ঘরে আটকে রাখে। একই ভয় মা-বাবাকে ঠেলে দেয় মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার দিকে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহনাজ পারভীন জানান, গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। প্রসবপূর্ব সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের হার বেড়েছে। মাঠের নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যন্ত গ্রামেও সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে পাবনার চাটমোহরের একটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ক্যাম্প করতে গিয়ে তিনি অন্য ছবি দেখেছেন। মা ও শিশুর চিকিৎসায় পরিবারের আগ্রহ আছে। সেই মায়ের বয়স ৩০-৪০ পেরোলে, অন্য রোগ দেখা দিলে তাঁকে আর চিকিৎসকের কাছে আনা হয় না। তখন যে পকেটের টাকা খরচ করতে হয়। পুরুষরা অবশ্য ডায়াবেটিস, চোখ বা চর্মরোগ নিয়ে ক্যাম্পে নিজেরাই এসেছিলেন। সংসারে নারীর শরীরের দাম যেন সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্তই।
দায় কার
লেখক ও গবেষক মেঘনা গুহঠাকুরতা মনে করেন, এ অবস্থা বহু বছরের বৈষম্যের ধারাবাহিকতা। নারী আজও গণপরিসরে অবাধে ও নিরাপদে চলতে পারেন না। রাষ্ট্র ও সমাজ সেই সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। দায় পরিবার ও সমাজেরও আছে; তবে রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র নারী নির্যাতনের মামলায় ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত গড়লে, পথঘাট নিরাপদ করলে সমাজেও তার ছাপ পড়ে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অর্জনকে স্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষমতায় বদলাতে না পারলে নারীর অগ্রগতি টিকবে না।
সান্ত্বনার জায়গা একটা আছে। এত বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ৭৯তম। এরপরই রয়েছে মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম, ভারত ১৩১তম, পাকিস্তান ১৪৩তম। তবে প্রতিবেশীর চেয়ে ভালো থাকা আর মানবিক বিচারে ভালো থাকা এক কথা নয়।
সূচকের এই পতন তাই নিছক পরিসংখ্যান নয়। যে মেয়ে পরীক্ষায় প্রথম হয়, তাকে চাকরিতে, মজুরিতে, সংসদে, এমনকি হাসপাতালের লাইনেও পেছনে দাঁড় করিয়ে রাখার হিসাব এটি। বই হাতে মেয়েরা নিজের পথটুকু হেঁটে এসেছে। বাকি পথ খুলে দেওয়ার দায় সমাজের, রাষ্ট্রের, দলের, পরিবারের।
লেখক: কান্ট্রি ফোকাল পয়েন্ট, এশিয়া দলিত রাইটস ফোরাম (এডিআরএফ) বাংলাদেশ
- বিষয় :
- শিক্ষা