ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকিতে ত্রুটি, বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্ররা

সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকিতে  ত্রুটি, বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্ররা
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারে ভর্তুকিতে বাংলাদেশ প্রতিবছর যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, তার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের কাছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও সার ভর্তুকি এবং নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সরকার বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করছে। অথচ এই সহায়তার একটি বড় অংশ যাচ্ছে দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণের পথে। যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার, তারা পাচ্ছেন কম। আর যারা তুলনামূলক ভালো আছেন, তাদের হাতে যাচ্ছে বেশি।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা গত দেড় দশকে বেড়েছে। কোনো না কোনো সহায়তা পাওয়ার কথা জানানো খানা বা পরিবারের অনুপাত ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি ২০২২ সালে বেড়ে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। তবু সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনও কোনো সুবিধার আওতার বাইরে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ৩১ শতাংশ কোনো না কোনো সুবিধা পেয়েছেন। নিচের ৪০ শতাংশের হাতে যাওয়া সুবিধার হার ২০১৬ সালের ৫১ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে প্রায় ৪৪ শতাংশে নেমেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আয়ের ক্ষেত্রে সমাজের নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ মানুষের (দরিদ্র) সঙ্গে সবচেয়ে ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ ধনীর মধ্যে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রাপ্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে সাত হাজার ১৪০ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা বছরে ১০ হাজার ৪৭২ টাকার এই সুবিধা পান।

নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা সরাসরি পান। অর্ধেকের মতো দরিদ্র পরিবার সরকারের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পায় না। অন্যদিকে ৩১ শতাংশ ধনী পরিবার সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সরাসরি সুবিধা পান।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও। গত চার বছরে দেশে ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে ভাটাসহ নানা কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এদিকে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে আছেন প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াসহ যে কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তারা দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। 
বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু দেশের অর্ধেক দরিদ্র মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান না। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচিতে মাত্র ৩৯ শতাংশ
সরকার ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু এর বড় অংশ দরিদ্রদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকিই মোট বরাদ্দের প্রায় ৪৩ শতাংশ। সরকারের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাসে ‘দরিদ্রবান্ধব’ হিসেবে চিহ্নিত ৪৮টি কর্মসূচি পায় মোট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশের মতো। আবার এর ভেতরেও প্রায় ৪৮ শতাংশ কেন্দ্রীভূত চারটি কর্মসূচিতে। এগুলো হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীর ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ গরিব মানুষকে খাবার কিনতে তাদের আয়ের ৬০ শতাংশ খরচ করতে হয়। বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে ১৬ লাখের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবে। কিন্তু এই কার্ড যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের দিতে পারলে বছরে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে।

বিদ্যুতের ভর্তুকি: বেশি যায় সচ্ছলদের কাছে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে ভর্তুকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সহায়তা-ব্যবস্থাগুলোর একটি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রায় আট হাজার ৫৮০ কোটি টাকা (জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় (জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। এর ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই বিদ্যুতের জন্য। 
প্রতিবেদন অনুসারে, বিদ্যুতের ভর্তুকির সুবিধা আয়ের স্তরে সমানভাবে ভাগ হয় না। বিদ্যুৎ খাতে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, এর সুবিধা ধনী-গরিব নির্বিশেষ পাওয়ার কথা। তবে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তারাই ভর্তুকির সুবিধা বেশি পান। বিশ্বব্যাংক হিসাব করে দেখিয়েছে, সমাজের নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছুটা বেশি পান। অন্যদিকে ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ মানুষ (তুলনামূলক ধনী) পান মোট ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ। এর মানে হলো, সমাজের ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ ধনীর জন্য বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশ খরচ হয়।

সারের ভর্তুকি: ছোট কৃষক পান কম
প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি ভর্তুকির বড় অংশ সারে। সার ভর্তুকি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রায় সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা (জিডিপির শূন্য দশমিক ২ শতাংশ) থেকে প্রায় চার গুণ হয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৮ হাজার কোটি টাকায় (জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) উঠেছে। সস্তা সার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বৈশ্বিক দাম ও মুদ্রা অবমূল্যায়নের ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে। কৃষি প্রবৃদ্ধি ২০১৬-২২ সময়ে দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখেছে। কিন্তু ভর্তুকির বণ্টনের ছবি এখানেও সমান নয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়ের ভিত্তিতে সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা ৩০ শতাংশ কৃষক পরিবার মোট ভর্তুকিভোগীর প্রায় অর্ধেক হলেও পায় সরাসরি সুবিধার মাত্র ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ পায় তারা। সবচেয়ে ধনী পঞ্চমাংশ উপকারভোগীর ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ তারা পায় ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। 

জমির মালিকানার হিসাবে বৈষম্য আরও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, সবচেয়ে বেশি জমির মালিক ২০ শতাংশ পায় মোট ভর্তুকির ৫০ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম জমির মালিক ৪০ শতাংশ পায় মাত্র ১৩ শতাংশ। এর কারণ ভর্তুকি সর্বজনীন এবং ব্যবহৃত সারের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। যে যত বেশি সার কেনে, সে তত বেশি সুবিধা পায়। দেশের ৯২ শতাংশ কৃষি খামার আড়াই একরের কম জমির। আধা একরের কম জমির প্রান্তিক খামার মোট খামারের ৪১ শতাংশ। কিন্তু তাদের হাতে আছে চাষযোগ্য জমির মাত্র ১১ শতাংশ।
সার ভর্তুকির আরও কিছু ত্রুটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ৮৫ শতাংশের বেশি সার আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন ও মুদ্রার ওঠানামায় ভর্তুকির বিল সহজেই বেড়ে যায়। ২০২৩ অর্থবছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ চলে যাচ্ছে ভর্তুকিতে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬৩ শতাংশ। কৃষি ও খাদ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ ভর্তুকি, অথচ কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ ৪ দশমিক ২ শতাংশ ও সম্প্রসারণসহ জ্ঞান বিস্তারে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বিতরণ ব্যবস্থা কাগজভিত্তিক, ডিলারদের ওপর নজরদারি দুর্বল, কৃষকেরা সরকারি দামের চেয়ে বেশি দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ আছে। ভর্তুকির একটি অংশ এমন সারে যাচ্ছে, যা ফলন বাড়ায় না।

সংস্কারের উদ্যোগ
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের কিছু ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরি হচ্ছে। অর্থ বিভাগের অধীনে সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার থেকে ব্যক্তি (জি-টু-পি) পদ্ধতিতে তিন কোটি ৫০ লাখের বেশি উপকারভোগীর কাছে অর্থ যাচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় এতে ফাঁকফোকর কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর) চালুর অনুমোদন দিয়েছে। দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে ঠিকভাবে শনাক্ত করাই এর লক্ষ্য। শুরুতে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, ফ্যামিলি কার্ড এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিতে এটি ব্যবহার হবে। পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে।
সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড গত মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়। এ কর্মসূচিতে নির্বাচিত পরিবারের একজন নারী সদস্য মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা বা বছরে ৩০ হাজার টাকা ডিজিটালভাবে পাবেন। প্রথম ধাপে লক্ষ্য ৪১ লাখ পরিবার। যোগ্যতা নির্ধারণ হবে হালনাগাদ প্রক্সি-মিনস টেস্টিংয়ের (পিএমটি) মাধ্যমে। পরে স্থানীয় যাচাই ও ডিএসআরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। পরিবারের অবস্থার উন্নতি হলে কর্মসূচি থেকে বের করে নতুন যোগ্য পরিবারকে যুক্ত করার ‘গ্র্যাজুয়েশন’ ব্যবস্থাও থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকির সুফল প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে কর্মসূচিগুলোর সংস্কার জরুরি। বিভিন্ন কর্মসূচির সমন্বয়ে সমন্বিত সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন ও যাচাইয়ে সরকারি তথ্যভান্ডারের আন্তঃসংযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং একক পরিচয়পত্র নিশ্চিত করতে হবে। এতে ভুলভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে। পাশাপাশি নিবন্ধন, অর্থ প্রদান ও সেবা দেওয়ার দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও কর্মসংস্থান সহায়তাও যুক্ত করতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় কমিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×