ডিম সিন্ডিকেট নিয়ে কল্পকাহিনি বিশ্বাস করবেন না
কাজী জীশান হাসান
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন কয়েক বছর ধরে অনেক পোলট্রি কোম্পানির বিরুদ্ধে কৃত্রিমভাবে মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ানোর অভিযোগ করছে। বেশ কয়েকটি পোলট্রি কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশও দেয়। তবে এসব কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট হয়েছে– কৃষিপণ্যের বাজারে দাম ওঠানামার পেছনে যে অর্থনৈতিক নীতিগুলো কাজ করে, কমিশন সেগুলো বুঝতে পারেনি।
প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুসন্ধানের পদ্ধতি ছিল উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের তুলনা। স্বল্প সময়ের জন্য ‘অস্বাভাবিকভাবে বেশি’ মুনাফাকে তারা যোগসাজশের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু এটি অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কৃষিপণ্যের বাজারে দামের ওঠানামা স্বাভাবিক ঘটনা। অন্য কৃষিপণ্যের মতো ডিম-মুরগিও কারখানায় তৈরি হয় না; বরং কয়েক মাস ধরে খামারে উৎপাদিত হয়। আজ বাজারে কী পরিমাণ সবজি পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করে গত সবজি উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা কত একর জমিতে সবজি লাগিয়েছিলেন তার ওপর। একই নীতি ডিম-মুরগির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বাজারমূল্য সব সময় নির্ধারিত হয় পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। আজ যদি কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকে, তাহলে সেটির বাজারমূল্য সেদিন বেশি হবে। আজকের বেশি বাজারমূল্য কৃষকদের পরবর্তী উৎপাদন চক্রে আরও বেশি উৎপাদনে উৎসাহিত করবে। অর্থাৎ আজকের বেশি দাম পরবর্তী উৎপাদন চক্রে বেশি উৎপাদন বা বেশি সরবরাহের দিকে নিয়ে যাবে। সেই বাড়তি সরবরাহ বাজারে পৌঁছালে দাম কমে যাবে।
কৃষিপণ্যের দাম স্বল্প মেয়াদে ওঠানামা করে। তবে খাদ্যের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে; যেমন জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাঝেমধ্যে ঘাটতি দেখা দেবে। এর ফলে বাজারমূল্যও মাঝেমধ্যে বেড়ে যাবে। এই বেশি দাম কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করবে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারমূল্যের ওঠানামার মধ্য দিয়েই ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ বাড়তে থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাঝেমধ্যে দাম বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক, যতক্ষণ একই পণ্য বিক্রির জন্য অনেক উৎপাদক একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন। বাস্তবে বাংলাদেশে মুরগি ও ডিমের বাজার প্রতিযোগিতামূলক। হাজার হাজার ক্ষুদ্র উৎপাদক এবং অল্পসংখ্যক বড় কোম্পানি ব্যবসায়ীদের কাছে এসব পণ্য বিক্রি করে। কোনো কৃষক বা কোম্পানি যদি তার এলাকার বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করে, ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে কিনবেন না। একজন অর্থনীতিবিদ বলবেন, যে বাজারে হাজার হাজার বিক্রেতা, সেটি একটি প্রতিযোগিতামূলক ও ন্যায্য বাজার এবং সেখানে যোগসাজশের সুযোগ সীমিত।
মুরগি বড় হতে সময় লাগে। একজন কৃষক আজ এক দিন বয়সী বাচ্চা কিনলে প্রায় ৩৫ দিনের মধ্যে ব্রয়লার মুরগি পাবেন। অথবা প্রায় চার মাস পর ডিম উৎপাদন শুরু হবে। কিন্তু ভবিষ্যতে ডিম বা ব্রয়লারের দাম কত হবে, তা কৃষকরা জানেন না। ভবিষ্যতের দাম কেউই নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারেন না। কোনো একটি উৎপাদন চক্রে উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি বা ঘাটতি থাকতে পারে। এ ধরনের ভারসাম্যহীনতার কারণেই দামের ওঠানামা হয়।
কৃষিপণ্যের দামের এই ওঠানামার ব্যাখ্যাকে বলা হয় ‘কবওয়েব থিওরি’। ১৯৩৪ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস কালডর এই নাম দেন। কয়েক বছরের মধ্যেই কবওয়েব থিওরি অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়। জিওফ্রে শেফার্ডের ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ‘এগ্রিকালচার প্রাইজ অ্যানালাইসিস’ বইতেও এ বিষয়ে অধ্যায় রয়েছে।
এবার ডিমের বাজারের দিকে তাকানো যাক। মাত্র কয়েক মাস আগেও ডিমের সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে এ বছরের প্রথম কয়েক মাসে ডিমের দাম কম ছিল। এতে কৃষক হতাশ হয়েছিলেন। ভবিষ্যতে কম ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে তাদের কমসংখ্যক এক দিন বয়সী বাচ্চা কিনতে উৎসাহিত করেছিল। এর ফলেই বর্তমানে ডিমের সরবরাহ কমে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখন বাজারমূল্য বেড়েছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই ঘাটতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বেশি দাম সরবরাহকারীদের মধ্যে কোনো যোগসাজশ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে। যখন ডিমের দাম কম ছিল, তখন কৃষকরা আজকের এই বেশি দাম অনুমান করতে পারেননি। তারা যদি ভবিষ্যৎ অনুমান করতে পারতেন, তাহলে আজ বিক্রি করার জন্য আরও বেশি ডিম উৎপাদন করতেন।
তবে বাজার নিজেই নিজেকে সংশোধন করে। কৃষকরা আজকের বেশি দামকে পরবর্তী উৎপাদন চক্রে বেশি উৎপাদনের প্রণোদনা হিসেবে দেখবেন। ফলে তারা এখন আরও বেশি এক দিন বয়সী বাচ্চা কিনবেন; কয়েক মাস পর বেশি ডিম উৎপাদন করবেন। অর্থাৎ এখনকার বেশি দামের কারণে আমরা কয়েক মাসের মধ্যেই বেশি ডিম উৎপাদন এবং ডিমের কম দাম আশা করতে পারি।
এই ঘটনাপ্রবাহ কৃষিপণ্যের বাজারে স্বাভাবিকভাবে দেখা দেওয়া দামের চক্রাকার ওঠানামাকেই বর্ণনা করে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, ঘাটতির স্বাভাবিক প্রতিকার হলো সাময়িকভাবে বেশি দাম। একটি প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে বেশি দাম সবসময় সরবরাহ বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম কমিয়ে আনে।
এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, যখনই ডিম বা ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে, তখনই প্রতিযোগিতা কমিশনের বারবার মূল্য কারসাজির অভিযোগ করা সঠিক ছিল না। কৃষিপণ্যের বাজারে চক্রাকার ওঠানামা স্বাভাবিক এবং এটি যোগসাজশের প্রমাণ নয়। যদি বেশি দাম এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হতো এবং ঘাটতি কমানোর জন্য সরবরাহ না বাড়ত, তাহলে পোলট্রি শিল্পের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তোলার ভিত্তি থাকতে পারত। কিন্তু এমনটি কখনও ঘটেনি। কবওয়েব থিওরি অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কৃষিপণ্যের দাম ওঠানামা করবে। ডিম ও ব্রয়লারের দামের রেকর্ড দেখায়, এসব পণ্যের দাম কবওয়েব থিওরির পূর্বাভাস অনুযায়ীই আচরণ করে।
পোলট্রি বাজার যে প্রতিযোগিতামূলক– তার আরও প্রমাণ রয়েছে। যদি কোনো সিন্ডিকেট দাম নিয়ন্ত্রণ করত, তাহলে ডিম ও ব্রয়লার উৎপাদনকারী খামারিরা কখনও লোকসান করতেন না। সিন্ডিকেট উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে সবসময় বেশি দাম ও মুনাফা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে ডিম ও ব্রয়লারের দাম নিয়মিত ওঠানামা করে এবং ডিম ও ব্রয়লার উৎপাদনকারী খামারিরা সাধারণত প্রতিবছর অন্তত কয়েক মাস লোকসান করেন। কৃষিপণ্যের যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কবওয়েব থিওরি এ ধরনের দামের ওঠানামারই পূর্বাভাস দেয়। ফলে আমরা যে দামের ওঠানামা দেখি, সেটিই একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারের প্রমাণ।
অন্যান্য দেশেও প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের সংস্থায় সাধারণত পেশাদার অর্থনীতিবিদরা কাজ করেন। বেশি দাম অবৈধ যোগসাজশের কারণে হয়েছে কিনা, তা নির্ধারণে অর্থনীতির বিষয়ে উন্নত পর্যায়ের জ্ঞান প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যক্রমে দেখা গেছে, তাদের অর্থনৈতিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। গত এক শতাব্দী ধরে বহু অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে কবওয়েব থিওরির মতো অর্থনৈতিক তত্ত্ব আলোচনা করা হলেও কমিশন এ ধরনের তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল না বলেই প্রতীয়মান।
প্রতিযোগিতা কমিশন যথাযথ ভিত্তি ছাড়াই কোম্পানিগুলোকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ এসব শিল্পে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং শিল্পের প্রবৃদ্ধি করেছে ধীর।
কাজী জীশান হাসান : কাজী ফার্মস গ্রুপের এক পরিচালক
- বিষয় :
- ডিম