ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ডিমের উৎপাদন বাড়লেও লাভ নেই খামারির

ডিমের উৎপাদন বাড়লেও লাভ নেই খামারির
×
×

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

উৎপাদন বাড়লেও ডিমের বাজার নিয়ে স্বস্তিতে নেই খামারিরা। ফিডের কাঁচামাল, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আবার খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী থাকায় খামারিরা দাম কম পাচ্ছেন। ভোক্তাও বেশি দামে ডিম কিনে খাচ্ছেন। ফলে ডিমের উৎপাদন বাড়লেও এর সুফল উৎপাদক ও ভোক্তা– দুপক্ষের মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে পুষ্টির সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে ডিমের গুরুত্ব তুলে ধরে আজ শুক্রবার বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। এ বছর দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য– ‘ডিমে পুষ্টি, ডিমে শক্তি, ডিমে আছে রোগ মুক্তি’। বিশ্বজুড়ে ডিমকে উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও সুস্থ বার্ধক্যে এর ভূমিকা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) যৌথভাবে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও পুষ্টিবিষয়ক কর্মসূচি থাকবে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে ডিম বিতরণের কর্মসূচিও রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় দুই হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ছয় কোটির বেশি ডিম। এতে দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৭টি। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করা।

ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ডব্লিউপিএসএ-বিবি) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, দেশে পোলট্রি উৎপাদন বাড়লেও অনেক খামারি লাভের মুখ দেখছেন না। উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় খামারির লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফা করছেন। গত ২০ মাসে দেশের ব্রিডার খামারগুলো প্রায় এক হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। পোলট্রি খাতকে এখন উৎপাদন বৃদ্ধির মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে পণ্যের মান, লাভজনকতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, উৎপাদনের পরিমাণগত সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়েছে। এখন বড় সমস্যা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া। খামার ও হ্যাচারি থেকে মুনাফার বড় অংশ সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চাহিদার সঙ্গে বাচ্চার সরবরাহের সমন্বয়, জাতীয় পোলট্রি নীতিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং বীমা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড চেইনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

গত এক দশকে দেশে ডিমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদন ছিল প্রায় এক হাজার ১৯১ কোটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় দুই হাজার ৪৪০ কোটি ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডিমের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদর নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, ফিডসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়ায় একটি ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ১১ টাকায় উঠেছে। সেখানে খামার পর্যায়ে ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য জানুয়ারিতে ছিল সাত টাকা ৯১ পয়সা, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়ায়। একই সময়ে খামার থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে ডিমের দাম সাধারণত আরও এক টাকা ৫০ পয়সা থেকে দুই টাকা পর্যন্ত বাড়ে।

বাংলাদেশে ডিমের প্রাপ্যতা বাড়লেও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় মানুষের ডিম খাওয়ার পরিমাণ এখনও কম। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা প্রায় ১৩৭টি। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০০টিতে নেওয়া। বিশ্বে ডিম উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটিতে বছরে প্রায় ৬১৭ বিলিয়ন বা ৬১ হাজার ৭০০ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আর মাথাপিছু ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে মেক্সিকো। সেখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৪০৯টি ডিম খান। জাপানে এ সংখ্যা ৩৩৭টি। উন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের ব্যবহার গড়ে ২৭০ থেকে ৩০০টির মধ্যে।

পুষ্টিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে ডিমের ব্যবহার বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। কারণ তুলনামূলক কম দামে উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়ার সহজ উৎস ডিম।
শিশুদের অপুষ্টি ও খর্বকায়তা কমানো এবং মেধার বিকাশে ডিমের ভূমিকা বিবেচনায় জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতেও ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ডব্লিউপিএসএ-বিবির সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; পোলট্রি শিল্পকে বিজ্ঞানভিত্তিক, নিরাপদ, টেকসই ও খামারিবান্ধব করতে হবে। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান, খাদ্যনিরাপত্তা ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোলট্রি খাত এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে সাফল্য মাপার সুযোগ নেই। খামারি কতটা লাভ করছেন, উৎপাদিত পণ্য কতটা নিরাপদ, বাজার কতটা স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা যাচ্ছে কিনা– এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা-ইউকে এগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, সর্বনিম্ন ফিড কনভার্সন রেশিও (এফসিআর) অর্জনই সর্বোচ্চ লাভের নিশ্চয়তা নয়। ওষুধ ব্যবহারের পর নির্ধারিত সময় মেনে চলা এবং উপযুক্ত ওজনের মুরগি বাজারজাতের মাধ্যমে খামারের আয় বাড়ানো সম্ভব।
চলতি বছর পোলট্রি খাতের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে উৎপাদন খরচ। ফিডের কাঁচামাল, বিশেষ করে ভুট্টা ও সয়াবিনজাত উপকরণের দাম বাড়ায় ফিডের দামও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ডিমের উৎপাদন ব্যয়ে।

পোলট্রি খামারিরা বলছেন, একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ডিমের দাম কমে গেলে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার বাজারে দাম বাড়লে তার পুরো সুফলও তারা পান না। রাজশাহীর পবা উপজেলার খামারি মোহাম্মদ হাফিজ জানান, তাঁর খামারে উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু লাভ বাড়েনি। তাঁর মতো ছোট খামারিদের বড় সমস্যা হলো ডিম দ্রুত বিক্রি করতে হয়। বড় খামারিরা নিজেরাই বাজারে যেতে পারলেও ছোট খামারিরা অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা বা স্থানীয় ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীল।
জামালপুরের এক খামারি মাহবুব হোসেন বলেন, ঢাকার পাইকারি বাজারের দর মোবাইলে জানা গেলেও মাঠপর্যায়ে সেই দামে ডিম বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার দামের ব্যবধান তৈরি হয়।

বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজন হলে এসব পণ্য রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো দরকার। তাঁর মতে, ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। এতে ডিম ও মুরগির বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহজামান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বেড়ে গেলে দেশীয় শিল্পমালিকদের পক্ষে লোকসান দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। মুরগির খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় বিকল্প ফিড ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের খামারিদের ফিডের দামের বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সমকালকে বলেন, উৎপাদন খরচ কমাতে খামারিদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিরাই পোলট্রি খাতের মূল চালিকাশক্তি। তাদের সহজ ঋণ, বিদ্যুৎ সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে কৃষক কার্ডের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন খরচ এমন পর্যায়ে রাখতে হবে যাতে খামারি টিকে থাকতে পারেন, আবার ভোক্তাকেও অতিরিক্ত দাম দিতে না হয়। ডিম, মাংস ও অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন পর্যায় থেকে নিয়মিত নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×