ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

সাফে এবার না হলে আর কবে

সাফে এবার না হলে আর কবে
×
×

ছবি- বাফুফে

সঞ্জয় সাহা পিয়াল

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৪

হয়তো স্টেডিয়ামের পাশে গুলিস্তান মোড়ে বাসস্ট্যান্ডের হাঁকডাকের ভিড়ে ফুটবলের এই আসরের টিকিট নিয়ে কোলাহল নেই; নেই কোনো আকাশচুম্বী সাফের বিলবোর্ডের চোখধাঁধানো জৌলুস কিংবা কোনো চেনা তারকার সুবিন্যস্ত অবয়ব। তবু শহরের গহিনে ফুটবলীয় যে উন্মাদনা যুগ যুগ ধরে সুপ্ত ছিল, তা কিন্তু উবে যায়নি; বরং তেইশ বছর ধরে ট্রফি না পাওয়ার এক বুক প্রচ্ছন্ন অভিমান আর সুতীব্র ভালোবাসার মলাটে মুড়িয়ে আজ ঢাকায় শুরু হচ্ছে ১৫তম সাফ ফুটবলের মহারণ, যা আজও একটি আস্ত প্রজন্মের কাছে খুব চেনা 'দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ'। 

এবারের আসরে বাংলাদেশ শুধু অরণ্যে রোদন করা কোনো স্বাগতিক দল নয়; বরং হামজা-শমিতদের মতো প্রবাসী বংশোদ্ভূত ও ঘরোয়া প্রতিভার এক অপূর্ব যুগলবন্দিতে গড়া এই লাল-সবুজ ব্রিগেড আক্ষরিক অর্থেই টুর্নামেন্টের 'হট ফেভারিট'। আজ সেই অবদমিত আবেগ আর এক আকাশ প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় স্টেডিয়ামের সবুজগালিচায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবলের এক নতুন স্বপ্নযাত্রা। যেখানে আজ নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

যদিও আজকের ম্যাচে বাংলাদেশের 'পোস্টার-বয়' হামজা চৌধুরী থাকছেন না, ইংল্যান্ডে ক্লাব ফুটবলের বাধ্যবাধকতায় তিনি আসবেন পরে; খেলবেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরের ম্যাচ থেকে। আসলে হামজার আগমনই হতে পারে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের জন্য উন্মাদনার প্রথম ধাপ। ১৯৯৩- লাহোর থেকে যখন এই আসরের যাত্রা শুরু, তখন থেকেই এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে ট্রফি জয় ছাড়াও বাংলাদেশ আরও দুবার ফাইনালে উঠেছিল এবং রানার্সআপ হয়ে আসর শেষ করেছিল।

আয়োজক হিসেবেও এর আগে তিন-তিনবার (২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮) নিজেদের ফুটবল আবেগের সাক্ষ্য রেখেছে বাংলাদেশ। আসলে এই টুর্নামেন্টটির মর্যাদা আর শ্রদ্ধা সবকিছুতেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। সর্বশেষ ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে এই আসরে তৃতীয় হয়েছিলেন জামাল ভূঁইয়ারা। ১৪ বছর পর সেবার গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে পেরেছিলেন জামালরা। এবার তাদের চোখ সাফের চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে। আসলে গেল বছর হামজার আগমনের পর থেকেই যেন নতুন করে সূর্যোদয় হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবলের। তাঁর আগমনের পর সেই যে ২২ বছরের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল ভেঙে এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে ভারতকে ১-০ গোলে চূর্ণ করল বাংলাদেশ, তা শুধু কোনো সাধারণ জয় ছিল না; তা ছিল এক অবদমিত জাতের জেগে ওঠার হুংকার। 

এ পর্যন্ত বাংলাদেশের জার্সিতে ১৩টি ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি নিজে যেমন চারটি মহামূল্যবান গোল করেছেন, তেমনি মাঝমাঠের সেই ইউরোপীয় ইস্পাতদৃঢ়তা দিয়ে দলকে এনে দিয়েছেন এক নতুন দিশা। এই বদলে যাওয়ার গল্পে হামজা অবশ্য একা নন; তাঁর সমান্তরালে দেশের ফুটবলকে সমৃদ্ধ করতে প্রবাসের আঙিনা থেকে একে একে ছুটে এসেছেন কানাডার মাঠ কাঁপানো শমিত সোম, ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবল থেকে আসা জিদান ইউসুফ, জায়ান আহমেদ ও ফারহান আলী ওয়াহিদ। গ্যালারির জৌলুসহীনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ৯ রত্নই এখন বাংলাদেশ ফুটবলকে প্রতিপক্ষের সামনে সমীহ জাগানোর অন্যতম কারণ। 

গতকাল যেমন শ্রীলঙ্কার কোচ আবদুল্লাহ আল মুতায়েরি বলেই দিলেন, তিনি ম্যাচ শেষে ফারহানের জার্সিটি চেয়ে নেবেন আর হামজারটা নেবেন তাদের অধিনায়ক সুজন পেরেরা। ভারতের কোচ নওশাদ মুসাও স্বীকার করেছেন, হামজা-শমিতদের এই বাংলাদেশ দলই এবারের সাফের ফেভারিট দল। পাকিস্তানের অধিনায়ক আলমগীর আলম খান জানিয়েছেন, আসরে সব দিক থেকেই শক্তিশালী বাংলাদেশ।
তাই কাগজে-কলমে কিংবা মাঠের শক্তিমত্তায় অন্যান্য দলের তুলনায় বাংলাদেশ যে এবার যোজন যোজন এগিয়ে, সেই অমোঘ সত্যটি এখন আর কোনো প্রচ্ছন্ন অহংকার নয়। বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে তাই এখন একটাই অবদমিত প্রশ্ন ও সুতীব্র হাহাকার- সব দিক থেকে অনুকূলে থাকা এমন সুবর্ণ সুযোগে এবার যদি ট্রফি না আসে, তবে আর কবে?

আরও পড়ুন

×