ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল বিএসইসি

১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল বিএসইসি
×

লোগো

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:০০

অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এক নির্বাহী পরিচালক, দুই পরিচালকসহ ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। বুধবার এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছে বিএসইসি। কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এছাড়া পাঁচ কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড হিসেবে তাদের বেতনবৃদ্ধিগুলো (ইনক্রিমেন্ট) বাতিল করে ওই পদে বেতনের নিম্নস্তরে নামানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবারই তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের ৫ মার্চ তৎকালীন কমিশন চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ কমিশনারদের অবরুদ্ধ করে প্রতিবাদসহ অফিস শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় তাদের এ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এতসংখ্যক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর ঘটনা এবারই প্রথম। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে গত বছরের ৪ মার্চ নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল তৎকালীন কমিশন। তিনি বিএসইসির কর্মকর্তাদের ওয়েলফেয়ার অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।

তাকে কারণ দর্শানোসহ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সাইফুর রহমানকে কেন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের অবরুদ্ধ করার অভিযোগ ওঠে।

এর আগে ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবির ভুঁইয়াকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ১৭ কর্মকর্তা হলেন— নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম, পরিচালক আবুল হাসান ও পরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মজুমদার। অন্যদের মধ্যে অতিরিক্ত পরিচালকরা হলেন- নজরুল ইসলাম, মোল্যা মো. মিরাজ উস সুন্নাহ। যুগ্ম পরিচালক রাশেদুল আলম।

অবসরে পাঠানো উপপরিচালকরা হলেন- মো. নান্নু ভূঞা, কাজী মো. আল-ইসলাম, সহিদুল ইসলাম, বনী ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হাসান। এছাড়া সহকারী পরিচালকদের মধ্যে যাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে, তারা হলেন- আমিনুল হক খান, সহকারী পরিচালক আবদুল বাতেন, সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন।

এছাড়া ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কাওসার পাশা বৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সমীর ঘোষকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিগত কমিশনের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত বছরের শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনাটি তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সাক্ষ্য নেয়। এর পর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি।

উল্লেখিত কর্মকর্তাদের বাইরে নির্বাহী পরিচালক মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা এসেছিল। তবে তিনি ওই ঘটনার পর নিজেই স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার চিঠি দিয়ে অফিস ত্যাগ করেছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার তাঁদের মৌখিকভাবে এই সিদ্ধান্ত জানানো হলেও আনুষ্ঠানিক চিঠি তাঁরা হাতে পান বুধবার। এই চিঠি সংগ্রহের জন্য অনেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হন।

২০২৫ সালের ৫ মার্চের ঘটনা

সাবেক নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএসইসির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

গত বছরের ৫ মার্চ বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ তৎকালীন চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও অন্যান্য কমিশনারদের কাছে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে অনুমতি ছাড়াই কমিশন সভা কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় অনেকে উচ্চ স্বরে ব্যাখ্যা চান।

ওই ঘটনায় তৎকালীন বিএসইসির চেয়ারম্যানের অভিযোগ- তাদের চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দপ্তরকক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সহায়তা চাইলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে তাঁদের সেই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন।

তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পাশাপাশি তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন কর্মকর্তা-কর্মচারিরা।

এমনকি প্রতিবাদের অংশ হিসেবে কর্মবিরতিও পালন করেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা সংবাদ সম্মেলন করেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেন। ফলে বিএসইসিতে কয়েক দিন ধরে একধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করে।

থানায় মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত

এই ঘটনার জেরে পরদিন অর্থাৎ ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা থানায় ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে এই মামলা করেন।

ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী এই ঘটনায় পৃথক বিভাগীয় মামলাও রুজু হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে চলা এই তদন্তে অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সরকারের পক্ষ থেকে মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা বিএসইসিতে পাঠানো হয়, যার ভিত্তিতেই সংস্থাটি সবশেষ এই সিদ্ধান্ত নিল।

আরও পড়ুন

×