সহযোগীকে দেখে আসামির বুকে ব্যথা, পরে মৃত্যু
হাবিবুর রহমান হাবিব
নিজস্ব প্রতিবেদক, উত্তরাঞ্চল ও বগুড়া ব্যুরো
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:১৬ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৩ | ১২:১৬
বগুড়ায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি ও আইনজীবীর সহকারী (মুহুরি) হাবিবুর রহমান হাবিবের (৪৫) মৃত্যু নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। পরিবারের তরফ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ করা হলেও সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে কোনো দাগ ছিল না। চিকিৎসকরা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তারা এটিকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ মনে করছেন। ঘটনা তদন্তে জেলা পুলিশ তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আটকের পর ডিবি পুলিশ হেফাজতে হাবিব ছিলেন ৩৫ মিনিট। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে শহরের জজকোর্ট সড়কের ঘোড়ামোড় এলাকা থেকে তাঁকে গোয়েন্দাদের একটি দল আটক করে। ডিবির জ্যাকেট পরা সদস্যদের দেখে নিজেকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করেননি তিনি। কিছু সময় কথা বলার পর স্বেচ্ছায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। পরে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে কার্যালয়ে নেওয়ার পর ১৫ মিনিটের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এর পর ৬টা ২০ মিনিটে তাঁকে দ্রুত ডিবির ব্যবহৃত একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে চিকিৎসার জন্য মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নেওয়া হয়। পথেই জ্ঞান হারান হাবিব। ৬টা ৫৫ মিনিটে জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর মেডিকেল অফিসার ডা. আতিকুর রহমান তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার পরও তাঁর জ্ঞান ফেরানো যায়নি। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সেখানকার মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক শামিম হোসেন তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শফিক আমিন বলেন, ভর্তি হওয়ার পর রোগীর হৃদকম্পন খুব কম ছিল। তাঁকে প্রাথমিকভাবে কার্ডিও পার্মোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) প্রয়োগ করা হয়। তবে হৃদকম্পন আর বাড়েনি। এর মধ্যে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
হাবিবের স্বজনের দাবি, ডিবি পুলিশের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক হাবিব শাজাহানপুরের জোড়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে।
পুলিশ বলছে, ঘটনার সময় ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শকদের কক্ষে আগে থেকেই আটক আসামি মনোয়ারাকে দেখতে পান হাবিব। এর পরই তিনি পুলিশের কর্মকর্তাদের কাছে বুকে ব্যথার কথা জানান।
সাইলেন্ট কিলিং
হাবিবের বিরুদ্ধে সাইলেন্ট কিলিংয়ের অভিযোগ ছিল। একটি হত্যা ধামাচাপা দিতে তিনি আরেকজনকে খুন করে বসেন। হত্যার শিকার দু’জন সম্পর্কে মা-ছেলে। এর পর পেশাদার খুনির মতো কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নিজের দৈনন্দিন কাজ করতেন হাবিব।
জানা যায়, গত ২ আগস্ট শাজাহানপুরের জোড়া গ্রামের ৮০ বছরের খুকি বেওয়া নিখোঁজ হন। দু’দিন পর ৪ আগস্ট গ্রামের পুকুর থেকে তাঁর বস্তাবন্দি ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে লাশের একটি পা পাওয়া যায়নি। দুই মাস পর গত মঙ্গলবার জোড়া গ্রামের মনোয়ারা বেওয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে লাশের হারানো পা ছালায় বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে বাড়ির মালিক মনোয়ারাকে পুলিশ আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে হাবিবের নাম উঠে আসে। পুলিশ বলছে, হাবিব ২০১৩ সালের এপ্রিলে খুকি বেওয়ার সৎছেলে বিপুল (১৫) হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি। মামলায় হাবিবের বাবা আব্দুল কুদ্দুসকেও অভিযুক্ত করা হয়।
খুকির আরেক ছেলে জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিবেশী মনোয়ারার বাড়ি থেকে পুলিশ মায়ের এক পা উদ্ধার করে। মনোয়ারাকে মা বিভিন্ন সময় আর্থিক সহযোগিতা করতেন। প্রতিবেশী হওয়ায় তাঁর বাড়িতে মায়ের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আসামিরা আমার আরেক ভাই বিপুলকে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য হত্যা করে। বগুড়া সদর উপজেলার কৈচড়ের রেললাইনের পাশ থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এ ঘটনায় হাবিব ও তার বাবা আব্দুল কুদ্দুসসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করা হয়। পুলিশ ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর ৭ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে ছেলে হত্যা মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী ছিলেন খুকি বেওয়া। আগামী ৩০ ডিসেম্বর থেকে এই হত্যা মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা ছিল। সাক্ষ্য গ্রহণের আগেই খুকি বেওয়াকে হত্যা করা হয়।
জানা যায়, হাবিবসহ চারজন খুকি হত্যায় জড়িত। হত্যার আগে মনোয়ারাকে দিয়ে পালপাড়া লিচু বাগানে খুকিকে ডেকে আনা হয়। এর পর হাত-পা ও মুখ বেঁধে নৃশংসভাবে খুন করে তারা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুমাইয়া সিদ্দিকার কাছে আসামি মনোয়ারা জানান, খুকিকে হত্যার পর তাঁর পা কেটে শরীর ছোট করা হয়। বস্তায় ভরে লাশ লুকানোর সুবিধার্থে হাবিব ও আনছার এ কাজটি করে। পরে লাশ পাশের পুকুরপাড়ে ফেলে রাখা হয়। আর কেটে ফেলা পা ছালার বস্তায় মুড়িয়ে মনোয়ারার বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতরে ফেলা হয়।
হাবিবের সুরতহাল প্রতিবেদন
এদিকে মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে শজিমেক হাসপাতাল মর্গে হাবিবের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রায়হানুল ইসলাম এ প্রতিবেদন তৈরি করেন। সুরতহালে বলা হয়েছে, হাবিবুরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাতের চিহ্ন নেই। পুরো শরীর স্বাভাবিক। সুরতহালের সময় হাবিবুরের মামা আইনজীবী মঞ্জুরুল হকসহ পরিবারের ছয় সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে আইনজীবী সহকারী সমিতির সচিব নুরুল ইসলাম বলেন, হাবিবুরের কানের পাশে একটি দাগ দেখেছি। তবে পুরো শরীর ভালো ছিল। হাবিবের মামা ও আইনজীবী মঞ্জুরুল হক বলেন, পুলিশ সাদা পোশাকে বিনা ওয়ারেন্টে তাকে আটক করে নিয়ে যায়। তার খোঁজে থানা ও ডিবি পুলিশের কাছে একাধিকবার ধরনা দিয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে এক সিনিয়র আইনজীবী আমাকে নিশ্চিত করেন, হাবিব ডিবি পুলিশের হেফাজতে আছে। পরে আমরা হাবিবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হই।
মঞ্জুরুল হক আরও বলেন, ডিবি পুলিশ তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বিচার দাবি করছি।
বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, এ ঘটনায় বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) স্নিগ্ধ আকতারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
