দৌলতপুরে দুস্থদের ভিজিটির কার্ডের চাল খাচ্ছেন ইউপি সদস্যরা
ইউপি সদস্যের নামে ভিজিটি কার্ড
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২০ | ০১:৪১
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সংরক্ষিত আসনের একজন মহিলা ইউপি সদস্য নিজের নামে দুস্থ নারীদের ভিজিডি কার্ড করেছেন। আর খোদ ইউপি চেয়ারম্যান ইউপি সদস্যের নামে সেই কার্ড ইস্যু করেছেন। এছাড়াও তিনি এক ভিজিডি কার্ডধারীর কার্ড চার বছর ধরে নিজের কাছে রেখে ওই কার্ডের চাল উত্তোলন করে আত্মসাত করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ থেকে জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য শারমিন সুলতানা ২০১৯ সালের ১১ মার্চ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেয়া মাসিক ৩০ কেজি খাদ্যশস্যের (চাল) ভিজিডি কার্ড নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজ নামে করে নিয়েছেন। তার কার্ড নম্বর ৬। কোন জনপ্রতিনিধির নামে ভিজিডি কার্ড দেয়ার নিয়ম না থাকলেও তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজশে এভাবে কার্ড দিয়ে চাল উত্তোলন করে আসছেন।
এছাড় একই ওয়ার্ডে তার প্রতিবেশি বৈরাগীর চর এলাকার পঞ্চাশোর্ধ বয়সী জামাল সরদার। ২০১৬ সালে তার নামে খাদ্য অধিদপ্তরের সুলভ মূল্যের (ওএমএস) ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড ইস্যু করা হয়। তবে সেই কার্ড চার বছর ধরেও হাতে পাননি জামাল সরদার এবং এ সম্পর্কে তিনি এতদিন কিছুই জানতেন না বলে জানিয়েছেন। চার বছর ধরে শারমিন সুলতানা নিজের কাছে রেখে ওই কার্ড ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করে আসছেন। ওই ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে এক বছর ধরে অপর এক ভাতাভোগী নারীর চাল আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি ওএমএস, ভিজিডি ও ত্রাণের বিষয়ে অনিয়ম ঠেকাতে সেনাবাহিনীর তৎপরতা শুরু হচ্ছে এমন খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল জামাল সরদারের বাড়িতে গিয়ে কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে আসেন ওই ইউপি সদস্য।
জামাল সরদার বলেন, চার বছর আগে ওএমএস'র কার্ড করে দেয়ার কথা বলে ওই ইউপি সদস্য ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি নিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমার কার্ড হয়নি। পরবর্তিতে তাকে জানানোও হয়নি ওই কার্ডের বিষয়ে। কয়েকদিন আগে এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসেছিলো খাদ্য সহায়তা দিতে। তাই দেখে ভয়ে মহিলা মেম্বার শারমিন সুলতানা আমার বাড়িতে এসে কার্ডটি পৌঁছে দেয়। চার বছর ধরে ভুয়া টিপসই দিয়ে তিনি আমার কার্ড দিয়ে চাল তুলে নিয়েছেন। আমি ওই কার্ড নিতে চাইনি, তবুও শারমিন জোর করে বাড়িতে কার্ড রেখে যায়। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন আগে জামাল সরদারকে এক বস্তা চাল আর কার্ড দিতে যান এই মহিলা ইউপি সদস্য। এসময় জামাল সরদার কার্ডটিতে একাধিক টিপ স্বাক্ষর দেখে কার্ডটি নিতে অস্বীকার করেন। এ নিয়ে এলাকায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
একই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের জিয়ারুল ইসলামের স্ত্রী মানছুরা খাতুনের অভিযোগও একই রকমের। তার নামে ২০১৯ সালে ভিজিডি কার্ড হলেও তিনি তা হাতে পাননি। তার অভিযোগ, এক বছর ধরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল উঠানো হয়েছে তার নামের কার্ড ব্যবহার করে। তার ভিজিডি কার্ডের নম্বর ৪।
মানছুরা খাতুন বলেন, ২০১৯ সালে মহিলা মেম্বার শারমিন সুলতানা আমাকে ভিজিডি কার্ড করে দেয়ার কথা বলেন। তার কথা অনুসারে আমার ছবি এবং ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি দেই। এরপর কার্ডের জন্য বহুবার ইউনিয়ন পরিষদে গেলেও কার্ড হয়নি বলে জানিয়ে দেন চেয়ারম্যান শাহ আলমগীরসহ পরিষদের অন্য সবাই। তবে তার ওই কার্ডে গত ১২ মাস ধরে টিপসই দিয়ে ভিজিডির চাল তোলা হয়।
সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে এক বছর পর মানছুরা খাতুনের নামে ইস্যুকৃত কার্ডটি তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এছাড়াও এভাবে ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সব সদস্যই ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের নিকটাত্মীয় ও একই পরিবারের লোকজনদের কার্ড দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য শারমিন সুলতানা বলেন, আমার নামে মহিলা অধিদপ্তরের ভিজিডি কার্ড রয়েছে। আমি নিয়মিত চাল পাই। আমি অসহায় এবং বিধবা নারী, আমার উপরে চেয়ারম্যানের নেক নজর আছে। তাই সেই কার্ড করে দিয়েছে।
২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, তিনি নিজের স্ত্রী, মা, বোনসহ নিকটাত্মীয়দের নামে ভিজিডি ও ওএমএস এর কার্ড করেছেন।
অভিযোগ স্বীকার করে নাসির উদ্দীন বলেন, আমার ভাই, ভাইয়ের বউয়ের নামে ভিজিডি কার্ড আছে। তবে আমার নামে নেই। আমার পরিবারে তিনজনের নামে কার্ড রয়েছে আমার স্ত্রী, আমার মা এবং আমার বিধবা বোন। চেয়ারম্যান ভাগ করে দিয়েছিল, আমরা সেগুলো করে নিয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইউপি সদস্য জানান, এখানে নিয়ম অনিয়ম যা কিছুই হয়েছে সবই মরিচা ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজসেই হয়। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সকল সদস্যই নিজ নামে বা পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ওএমএস ও ভিজিডি কার্ড ইস্যু করে সরকারি চাল নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মরিচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলমগীর বলেন, ইউপি সদস্যের নামে ভিজিডি কার্ড করা যাবে কিনা সেটা আমার জানা ছিল না। অনেক মেম্বারই ওই সময় না বুঝে এমনটি করেছেন। তাছাড়া নিয়ম না থাকলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব কার্ড অনুমোদন দিলেন কিভাবে? ইউপি সদস্য ও তার পরিবারের নামে কার্ডের কথা স্বীকার করে শাহ আলমগীর বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ মেম্বারই গরিব। ফলে এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে।
এ দিকে, উপজেলার খলিষাকুন্ডি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলাম একই ওয়ার্ডের মদিনা খাতুন নামে এক দুস্থ মহিলার ভিজিডির কার্ডের (কার্ড নং ৭১) চাল এক বছর ধরে গোপনে উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হলে কয়েকদিন আগে ওই কার্ড মদিনা খাতুনের কাছে হস্তান্তর করেন ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলাম।
দৌলতপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ইশরাত জাহান বলেন, কোনো জনপ্রতিনিধি অথবা সরকারি কর্মচারী নিজ নামে ভিজিডিসহ এ ধরনের কার্ড ইস্যু করার কোনো নিয়ম নেই। যতই অসচ্ছল হোক এটি আইনসম্মত নয়। আমাদের নির্দেশনা দেয়া ছিল, যেন এ ধরনের অনিয়ম না করা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বলেন, অনিয়মগুলো তার জানা ছিল না। বিষয়গুলো ক্ষতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
- বিষয় :
- দৌলতপুর
- ভিজিডি কার্ড