টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া-চকরিয়ায় পানিবন্দী হাজারো মানুষ
ছবি: সমকাল
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) ও চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৫৬ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৫৭
বিগত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এবং কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পাড় উপচে সাতকানিয়ার লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে, অন্যদিকে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ৭০টি গ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিন উপজেলাতেই মাধ্যমিক পর্যায়ের বুধবার ও বৃহস্পতিবারের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
সাতকানিয়ায় টানা বৃষ্টি ও ঢলে সাঙ্গু নদীর বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া পয়েন্ট দিয়ে পাড় উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে বাজালিয়া, ছদাহা, কেঁওচিয়া, ঢেমশা, নলুয়া, আমিলাইষ ও চরতি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় জরুরি প্রয়োজনে নৌকায় যাতায়াত করছেন মানুষ। বিদ্যুৎহীনতায় ভোগান্তির পাশাপাশি তলিয়ে গেছে কয়েক লাখ টাকার মাছের ঘের।
এদিকে, চকরিয়া ও মাতামুহুরিতে চার দিনের বিরামহীন বৃষ্টি এবং পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় অন্তত ৭০টি গ্রামের প্রায় ৫ হাজার পরিবার জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। আমন বীজতলাসহ সবজিক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। এছাড়া চকরিয়ার বন বিভাগের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হলেও অনেকেই সরছেন না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, চকরিয়ার বমু বিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, বরইতলী, হারবাং, ফাসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর, পূর্ব বড়ভেওলা, সাহারবিল, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড়ভেওলা ও বদরখালী ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রাম বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সাতকানিয়ার বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এই এলাকার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আমাদের বাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে। বর্তমানে আমরা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় আশ্রয় নিয়েছি। এ ছাড়াও আমাদের চলাচলের একমাত্র সড়কটিতে কোমরসমান পানি হওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
মৎস্যচাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, গত রাতে একটি পুকুরের চারপাশে জাল দিয়ে ঘের করার পরও সেটি ডুবে গেছে। ফলে ওই পুকুরে থাকা কয়েক লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এ ছাড়াও হরিণতোয়া সড়কের প্রবেশমুখের পুকুরটিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তারপরও চারপাশে জাল দিয়ে মাছ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
পানিবিজ্ঞান উপবিভাগ চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান হাসান বলেন, সাঙ্গু নদীর দোহাজারী পয়েন্টের বিপৎসীমা ৬.৫৫ মিটার। আজ বুধবার সকাল ৬টায় ৫.৭২ মিটার, ৯টায় ৫.৮৭ মিটার এবং বেলা ১২টায় ৫.৯২ মিটার সীমা বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পাহাড়ি ঢলের কারণে সাঙ্গু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে নদীর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করছি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। যেসব এলাকায় মানুষ বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সেসব এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা প্রদানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। এ ছাড়াও আমরা জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত সহায়তা পান।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. অমিত দে বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়নভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।”
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, পাহাড় ধস ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে স্থগিত করা হয়েছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা।
অন্যদিকে চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, আমন বীজতলাসহ সবজিখেতের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে; তবে বৃষ্টি কমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে রাতে উজানে ভারী বৃষ্টি হলে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। চকরিয়া বন বিভাগের পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা মাইকিং করলেও লোকজন সরছে না।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম জানান, তাঁর ইউনিয়নে কয়েক শত পরিবার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। একই কথা বলেছেন খুটাখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুর রহমান।