‘নাই বাওয়া, হামার কিচ্ছু নাই, ঘর-বাড়ি সব হারাচি’
ছবি- সমকাল
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৭:২৭
‘নাই বাওয়া, হামার কিচ্ছু নাই। এক ব্যাটা তাই ঢাকাত গেচে। এই নদীত যে কতবার ঘর-বাড়ি, জমি সব হারাচি, সেটা কলে বিশ্বাস হবার নয়। এখন আর একটা মাত্র ছোট ঘর ছাড়া কিছুই নাই।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দা জেলেখা বেগম। চার দফা নদীভাঙনে সব হারিয়ে শেষ আশ্রয়টুকুও এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে তার।
গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও ভয়াবহ আকার নিয়েছে নদীভাঙন। টানা ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সদর ও সাঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত বিঘা আবাদি জমি, অসংখ্য বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। চোখের সামনে শেষ সম্বল হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড লোকদেখানোভাবে কয়েকটি জিও ব্যাগ ফেলে দায়িত্ব শেষ করছে। অথচ স্থায়ী তীর সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রতি বছর একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের পুঠিমারি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে কচু, পাট ও ধানের ক্ষেত, গাছপালা এবং বসতভিটা। এলাকার শহিদুল মিয়া, সৈয়দ জামাল, সেকেন্দার আলী, মোর্শেদা বেগম, লাকি বেগমসহ অসংখ্য পরিবার জমিজমা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
দুই বছর আগেও প্রায় ১০০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন পুঠিমারি গ্রামের কৃষক সৈয়দ জামাল। নদীর মাঝখান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে পাট, কচু, ধান আর গরুর জন্য ঘাস আবাদ করতাম। কিন্তু কয়েক দিনের ভাঙনে চোখের সামনে ৭০-৮০ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজনের আরও শত বিঘা জমিও বিলীন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলেও লাভ হয়নি। তারা কয়েকটা বালুর বস্তা ফেলে চলে যায়। এখন পরিবার নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।’
একই গ্রামের আমজাদ হোসেন বলেন, ‘চলতি বছর ২০-২৫ বিঘা জমিতে কচু আবাদ করেছিলাম। কয়েক দিনের ভাঙনে সব শেষ। এখন নিজের জমি বলে কিছুই নাই। ৭-৮ বিঘা জমিও নদীতে গেল। যেখানে ভাঙন হচ্ছে সেখানে কেউ আসে না, আর যেখানে ফসলই নেই, সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়।’
শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম জানান, প্রায় দুই মাস ধরে তার ইউনিয়নে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৭৫টি পরিবারের প্রায় ৩০০ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এত মানুষকে নিঃস্ব হতে হতো না।
ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব রসুলপুর গ্রামেও একই চিত্র। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের ভয়াবহ ভাঙনে পুরো গ্রামটি একসময় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। প্রায় দেড় দশক আগে নতুন চর জেগে উঠলে মানুষ আবার সেখানে বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু চলতি বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের নতুন ভাঙনে সেই জনপদ আবারও হুমকির মুখে।
ভাঙনের শিকার আলম মিয়া বলেন, ‘এক বছর আগেই অনেক জমি-ঘর হারিয়েছি। এবার আবার সব শেষ হওয়ার পথে। এখন পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কেউ একটা বস্তাও ফেলেনি। তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?’
একই গ্রামের রহিমা বেগম বলেন, ‘চারবার তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। ভিক্ষা করে কোনো রকমে জীবন চলত। এখন নদী সেই শেষ জায়গাটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব—কোনো পথ দেখছি না।’
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি মজিবুর রহমান বলেন, প্রতি বছর একই সংকট দেখা দিলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। আগাম পরিকল্পনা ও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানা সালু জানান, শুধু রসুলপুর গ্রামেই শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টি পরিবার তাদের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, জেলার সাত উপজেলায় বন্যায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া ১১৬ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূ্ত্র জানায়, জেলার চার উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার নদীশাসন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আপাতত জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আগামী শুকনো মৌসুমে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।’