ডাক্তার সেজে কোমরের ব্যথায় দিলেন ক্যান্সারের ওষুধ, মৃত্যুশয্যায় কৃষক
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে ভুয়া চিকিৎসক প্রসূন বালার ‘প্রত্যাশা ফার্মেসি’। ছবি: সমকাল
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪ | ২০:৩১
চাকরি করতেন ওষুধ কোম্পানিতে। দোকানে দোকানে ঘুরে কাটতেন অর্ডার। সেই চাকরি ছেড়ে খোলেন ফার্মেসি। ওষুধ বেচতে বেচতে টুকটাক চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। এক পর্যায়ে নিজের নামে প্যাড তৈরি করে সাজেন চিকিৎসক। রীতিমতো প্রেসক্রিপশন লিখে কারবার চালাতে থাকেন প্রসূন বালা। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের জলিরপাড় বাজারের এই ভুয়া চিকিৎসকের অপচিকিৎসার শিকার হয়েছেন এক কৃষক। কোমরের ব্যথা নিয়ে তাঁর কাছে যাওয়ার পর সর্বনাশ হয়েছে; বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছেন তিনি। এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে প্রসূনের ‘প্রত্যাশা ফার্মেসি’তে অভিযান চালিয়ে সেটি বন্ধ করার পাশাপাশি গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে প্রতারককে।
জানা গেছে, এমএ পাস করেও এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে প্যাড ছাপিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিলেন প্রসূন। লিখতেন অনিবন্ধিত ও নিষিদ্ধ অনেক ওষুধ। বিক্রি করতেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও। প্রত্যাশা ফার্মেসিতে বসে দেদার অসহায়-সহজসরল রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন তিনি।
ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানান, গত ১৫ জুন প্রসূনের কাছে কোমরের ব্যথার ওষুধের জন্য যান উপজেলার ভাটরা গ্রামের কৃষক সুকণ্ঠ মণ্ডল। তাঁকে একটি প্রেসক্রিপশন করে ৯ ধরনের ওষুধ দেন ফার্মেসি মালিক। সেখানে আর্থ্রাইটিস ও ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ মেথোট্রেক্স ১০ এমজিসহ বেশ কয়েকটি ভিন্ন রোগের ওষুধও লেখা হয়। অথচ রোগীকে এ ওষুধ দেওয়ার আগে নানা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, আর সাধারণত সপ্তাহে একটি করে খেতে বলা হয়। কিন্তু সুকণ্ঠকে দৈনিক দুটি করে মেথোট্রেক্স খেতে বলা হয়। ওই ওষুধ খেয়ে তিন দিনের মাথায় সুকণ্ঠের শরীর ও মুখে ক্ষত তৈরি হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ১৯ জুন ফরিদপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ২৫ জুন রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি এ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছেন।
গত ২৭ জুন প্রসূনের নামে গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী সুকণ্ঠর মেয়ে চৈতালী সরকার। তিনি বলেন, “বারডেমের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ‘মেথোট্রেক্স’ ক্যান্সারের ওষুধ। এটি খেয়েই রোগীর দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। হার্ট ও পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রসূনের অপচিকিৎসায় আমার বাবার এ পরিণতি হয়েছে।”
অভিযুক্ত প্রসূন বালা গ্রেপ্তারের আগে বলেন, ‘এ ওষুধ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা লেখেন। আমার লেখার এখতিয়ার নেই। তারপরও লিখেছি রোগীকে সুস্থ করার জন্য। রোগীকে বলেছি, কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিতে। তিনি ফোন দেননি। ফোন দিলে এ ওষুধ বন্ধ করে দিতাম। তা হলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।’
সিভিল সার্জন ডা. জিল্লুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার প্রত্যাশা ফার্মেসিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে ফার্মেসির মালিক প্রসূনকে তিন মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ দোকানটি সিলগালা করা হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রায়হান ইসলাম শোভন বলেন, জলিরপাড় বাজারের প্রত্যাশা ফার্মেসিতে বিপুল পরিমাণ অনিবন্ধিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভুয়া চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- গোপালগঞ্জ
- ফার্মেসি
- ভুয়া চিকিৎসক
