ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

এখনও স্বজনের খোঁজ না পাওয়ার বেদনা

এখনও স্বজনের খোঁজ না পাওয়ার বেদনা
×

পিনাক-৬ লঞ্চডুবির পর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটে নিখোঁজ ব্যক্তিদের এসব ছবি জমা দিয়েছিলেন স্বজনরা

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু, মুন্সীগঞ্জ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০৫

ঈদ এলেই আমানুল হকের পরিবারে নেমে আসে বিষাদ। তাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা। ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট পদ্মা নদীতে পিনাক-৬ লঞ্চডুবিতে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের সব পরিবারেই একই আবহ ছড়িয়ে পড়ে। মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় 
সরকারি হিসেবে নিখোঁজ হন ১৩৬ জন। তাদের মধ্যে উদ্ধার হয় ৬২ যাত্রীর মরদেহ, তাদের ১৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আজও খোঁজ মেলেনি বাকি ৭৪ জনের। 
আজ সেই দুর্ঘটনার ১১ বছর। এ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ তালিকায় থাকা ঢাকার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ইমা আক্তারের দাদা মো. আমানুল হক মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বেতকা ইউপির সাবেক সদস্য। ইমা সেবার ঈদুল ফিতর উদযাপনে গিয়েছিলেন মাদারীপুরের খালাসীকান্দি গ্রামের নানাবাড়িতে। ৪ আগস্ট কাওড়াকান্দি থেকে পিনাক-৬ লঞ্চে ওঠেন তিনি। লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার অদূরে পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। আমানুল হক বলেন, টানা ৯ দিন আদরের নাতনির সন্ধানে লৌহজং, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলাসহ ভাটি অঞ্চলের নদীগুলোতে স্বজনদের নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোথাও মেলেনি মরদেহ।
স্বজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রিয়া আক্তারও। তাঁর বাড়ি মাদারীপুরে শিবচর উপজেলার দৌলতপুরে। সেবার তাদের সঙ্গে ঈদ করতে ঢাকা থেকে পরিবারসহ এসেছিলেন ভাই ফরহাদ মাতুব্বর। ঢাকায় ফেরার পথে ওই লঞ্চ দুর্ঘটনায় ফরহাদ, তাঁর স্ত্রী শিল্পী আক্তার, এক বছর বয়সী ছেলে ফাহিম ও শ্যালক বিল্লাল হোসেন নিখোঁজ হন। আজও মেলেনি তাদের লাশ। 
প্রিয়া আক্তার বলেন, প্রতিবছর ঈদ তাদের পরিবারে যন্ত্রণা নিয়ে আসে। তখন যদি পদ্মা সেতু থাকত, তাহলে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে হতো না। 
এমন অসংখ্য বেদনার স্মৃতি বহন করা খরস্রোতা পদ্মায় ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ওই সেতু দিয়ে গাড়িতেই যাতায়াত করছেন মানুষ। স্বজনহারা লোকজন বলছে, সেতু হওয়ায় পদ্মায় ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় শেষ। কিন্তু ঈদ এলেই নিখোঁজ থাকা স্বজনের লাশ না পাওয়ার বেদনা তাদের ঘিরে ধরে।
ওই দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পিনাক-৬ লঞ্চে আড়াই শতাধিক যাত্রী থাকার কথা জানানো হয়। যদিও প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা জানিয়েছিলেন, লঞ্চটিতে অন্তত সাড়ে তিনশ যাত্রী ছিল। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা ও পুলিশ মাওয়া ঘাটের স্পিডবোট ও অন্যান্য নৌযান নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। তখন আনুমানিক ১১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।
নানা জায়গা থেকে উদ্ধার হয় ৬২ যাত্রীর মরদেহ। তাদের মধ্যে ৪৭ জনের পরিচয় মেলে। এ ছাড়া ১৫ যাত্রীর পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাদের মরদেহ শিবচরের পাচ্চর এলাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। 
নিখোঁজ তালিকায় নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকার শহীদুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম, মেয়ে সারা আক্তার; গোপালগঞ্জের মোকসেদপুরে মিলনের মেয়ে মেঘলা আক্তার, সচিবালয়ের পরিবহন পুলের ইব্রাহিম হোসেনের মেয়ে ইসরাত জাহান মীম, ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামের বিপুল মোল্লার ছেলে মিজানুর রহমান ও শিবচরের রামেরকন্দি গ্রামের সিদ্দিক মিয়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তার, মানিকপুর গ্রামের লাল মিয়ার মেয়ে ফালানি, এগারোরশি গ্রামের খবিরউদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া, পলি বেগম; আরমিন, আরফিন, ইমতিয়াজ রহমান, দিপা আক্তার, রাব্বি, হানিফ, মেরি আক্তার ও রবিউলের স্বজনরা এখনও কেঁদে ফেরেন। 
এমনই এক সন্তানহারা বাবা শিবচর পৌর এলাকার মো. নুরুল হক। তাঁর বড় মেয়ে নুসরাত জাহান হীরা পড়তেন ঢাকার শিকদার মেডিকেল কলেজে। ছোট মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা স্বর্ণা ছিলেন রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ কলেজের ছাত্রী। তাদের সঙ্গেই ডুবে যায় খালাতো বোন এলাকার জান্নাতুল নাঈম লাকী। তিনি চীনে ডাক্তারি পড়তেন। দুর্ঘটনার পর হীরা ও লাকীর মরদেহ উদ্ধার হলেও স্বর্ণার খোঁজ মেলেনি। মৃত্যুর আগে তোলা তিন বোনের সেলফি তখন দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। সেই সেলফিই মেয়ের শেষ স্মৃতি নুরুল হক মিয়ার কাছে। তিনি বলেন, ‘তিন সন্তানের মধ্যে আমার মেয়ে দুইটা চলে গেল একসঙ্গে। ঘরে ঢুকলেই তাদের কথা মনে পড়ে। খেতে বসলে মনে পড়ে, রাস্তাঘাটে মনে পড়ে। মনের দুঃখে শুধুই কান্নাকাটি করি। হীরারে না হয় কবর দিছি, স্বর্ণারে তো তা-ও পারি নাই। বড় সাধ ছিল বড় মেয়েটারে ডাক্তার বানাব। মেডিকেল কলেজে ভর্তিও করেছিলাম। ওর সঙ্গে ঢাকায় যখনই দেখা করতে যেতাম, দেখতাম ও ক্লাস থেকে অ্যাপ্রোন পরে আমার সামনে আসত। কী যে ভালো লাগত! কিন্তু আজ হীরা নেই।’ বলেই কেঁদে উঠেন নুরুল হক।
লৌহজং থানা সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মামলাটি সেখানেই বিচারাধীন।
মুন্সীগঞ্জ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল হালিম জানান, পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় হওয়া মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। প্রধান আসামি লঞ্চমালিক আবু বক্কর সিদ্দিক কালু মিয়া মারা গেছেন। অন্য চার আসামি জামিনে আছেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়। পলাতক চার আসামির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনও তামিল হয়নি। বিচারের জন্য ১৩ বার সময় নির্ধারণ হলেও বাদী তৎকালীন বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিতে আসেননি। এ ছাড়া সাক্ষ্য দেননি ৩০ সাক্ষীর কেউই। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। 
মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ শামসুল আলম সরকারের ভাষ্য, এই মামলাটি আলোচিত। কেন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসছেন না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবেন। 

আরও পড়ুন

×