প্রতারকদের পকেটে শতকোটি টাকা, ট্রাভেল এজেন্সিতে তালা
.
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩৮ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:০১
ছাতকের সিংচাপইড় গ্রামের তরুণ জুবেদ আহমদ। টাকা ধার করে ওয়ার্ক পারমিটে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যোগাযোগ করেন সিলেট নগরীর তালতলায় গোল্ডেন ওভারসিজ ট্রাভেলসে। এটির মালিক জুনেদুজ্জামান আকন্দের সঙ্গে চুক্তি করে দুই দফায় ১৯ লাখ টাকা দেন। দূতাবাসে সাক্ষাতের তারিখও জানানো হয়। তবে সেই সাক্ষাতের স্লিপ ছিল জাল।
জুনেদুজ্জামানের বাড়ি বিয়ানীবাজারের চারখাই। যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট ও কাজের ভিসার জন্য কমপক্ষে ১৩০ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। জুবেদ ছাড়াও বিশ্বনাথের বেলাল আহমদের ৩৬ লাখ ও বড়লেখার কাউসার আহমদের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা নেন। এ ছাড়া অনেকে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেককে দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের ভুয়া কাগজ দেন তিনি। প্রায় ৮-১০ কোটি টাকা নিয়ে জুনেদ তিন মাস আগে অফিস বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। গত ২৯ জুলাই অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ চলছে।
গোল্ডেন ওভারসিজের মতো সিলেট নগরীর ২০ থেকে ২৫টি ট্রাভেল এজেন্সি ও কনসালটেন্সি ফার্ম মালিকের কাছে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের শতকোটি টাকা আটকে আছে। অনেকে টাকা মেরে বিদেশে চলে গেছেন, কেউবা আত্মগোপনে। কেউ কেউ আছেন কারাগারে।
কয়েক বছর ধরে ভিসার জন্য জমা দেওয়া টাকা উদ্ধারে গলদ্ঘর্ম হচ্ছেন অনেকে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জন ভুক্তভোগী মামলা করেছেন মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও আদালতে। যারা মামলা করেননি, তারা আপসে ও বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। টাকা উদ্ধার না করতে পেরে অনেকে দিশেহারা।
প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে এমন আরও ছয়টি এজেন্সি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে তালাবদ্ধ। এগুলোর একটি নগরীর জিন্দাবাজরে হক সুপার মার্কেটর আমিন রহমান ট্রাভেলস। অভিযোগ উঠেছে, রোমানিয়ার ভিসা দেওয়ার নামে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন প্রতিষ্ঠানের মালিক আমিন রহমান এবং তাঁর ভাই ছিদ্দিকুর রহমান ও জিয়াউর রহমান। ২৫০ থেকে ৩০০ জনের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেন। এমনকি অনেকের পাসপোর্টে রোমানিয়ার জাল ভিসা লাগান। গত তিন বছরে থানা ও আদালতে কয়েকটি মামলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের পক্ষে একটি মামলার বাদী ফখরুল ইসলাম। এই মামলায় আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিন্দাবাজারের ওয়েস্ট ওয়ার্ড শপিং সিটিতে স্ট্যালার কনসালট্যান্টস নামে অফিস খোলেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদ রোডের বাসিন্দা মুনতাসির মাহবুব। বিভিন্নজনের কাছ থেকে তিনি স্টুডেন্ট ভিসার জন্য টাকা নেন। কয়েকজন ভিসা পেলেও আটকে যান ১৯ জন। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত টাকা উদ্ধারে তাঁর কাছে ধরনা দেন সেই ১৯ জন। শেষ পর্যন্ত সিলেট ছেড়ে চলে যান মুনতাসির। ১৯ জনের কাছ থেকে তিনি এক কোটি ২৬ লাখ টাকা নেন। তাদের একজন দোয়ারাবাজারের শাহ আলম। দেড় বছর অপেক্ষার পর চলতি মাসে মামলা করেছেন। গত ২৯ জুলাই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
দুই বছর আগে যখন স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার হিড়িক পড়ে, তখন নগরীর হাওয়াপাড়ায় উইনার অ্যাসোসিয়েট নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার স্থানীয় বাসিন্দা ফাবিহা কাদিরের বিরুদ্ধে চার-পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য সরকার পতনের আগে ও পরে দফায় দফায় লোকজন তাঁর অফিসে যান। রাজনৈকি নেতাদের মদদে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন ফাবিহা। কয়েক মাস আগে অফিস বন্ধ করে দেন তিনি। প্রতারিত লোকদের মধ্যে আমির উদ্দিন তাঁর স্বজনদের কাছ থেকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের ভিসার জন্য ২৮ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তিনি গত বছর ১৯ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। স্থানীয় বাসিন্দা জুরেজ আব্দুল্লাহ গোলজার সমকালকে বলেন, গত বছর অনেক লোক টাকা না পেয়ে অফিসে চড়াও হয়েছিল, এতে এলাকার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। এখন প্রতিষ্ঠানটি এখানে নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় প্রতারণা করে নগরীর জিন্দাবাজারের অ্যালিগেন্স শপিং সিটির স্কাই ড্রিম নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নোয়াখালীর বাসিন্দা ইমামুল হক বাঁধনসহ কয়েকজন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাজের ভিসার জন্য প্রায় ২০০ জনের কাছ থেকে তারা বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেন। গত মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। গত ৪ জুলাই বাঁধন অফিসে এলে ভুক্তভোগীরা তাঁকে আটক করে পুলিশ দেন। উপস্থিত ১৫ জনের পক্ষে মামলা করেন টুকেরবাজারের জাহেদ আহমদ। তিনি সমকালকে জানান ২০০ লোকের কাছ থেকে কমপক্ষে চার কোটি টাকা নেন বাঁধন। তিনি এখন কারাগারে। আটকের সময় বাঁধন জানান, বিভিন্ন খাতে টাকা-পয়সা খরচ হয়েছে। সমস্যার কারণে ভিসা হয়নি। তারা টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নগরীর সুরমা মার্কেটের ভাই ভাই ট্রাভেলসের মালিক ছাতকের পৈলেনপুরের বাসিন্দা মইন উদ্দিন। ফ্রান্স, আলবেনিয়া, গ্রিস ও ইটালিতে কাজের ভিসার কথা বলে গত বছর ১৬ যুবকের কাছ থেকে টাকা নেন। এর মধ্যে ছাতকের জাতুয়ার কয়েছ মিয়ার ২০ লাখ, জলসি গ্রামের নাজমুল হোসেনের আট লাখ, সুনামগঞ্জের সুহিবুরের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেন। মইন রাজধানীর আরামবাগ এলাকায় কাশেম সেন্টারের ‘মরুর হজ কাফেলা’ নামে আরেক ট্রাভেলসের মালিক মীর্জাগঞ্জের নাসির উদ্দিনের মাধ্যমে কাজ করাতেন। হঠাৎ করে সিলেট ও ঢাকার অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ২২ মার্চ বিদেশ পালিয়ে যান মইন। ভুক্তভোগী ছাতকের ভুইগাওয়ের রহমান আলী সমকালকে জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন; কিন্তু পারছেন না। তিনি মামলা করবেন।
তালতলার আরেক প্রতিষ্ঠান ইনফ্যাক্ট গ্লোবাল। প্রতিষ্ঠানের মালিক সজিব কান্তি পাল গত বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত ইউরোপে কাজের জন্য ৩০-৪০ জনের কাছ থেকে টাকা নেন। কয়েকজনের কাছ থেকে বিমানের টিকিটের জন্য ঢাকা নেন। কিন্তু বিমানবন্দরের সামনে থেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলার আনোয়ার হোসেনের ৩৫ লাখ, সিলেটের গোলাম মোস্তফার ২৮ লাখ, জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জের সুন্দর আলীর পাঁচ লাখ টাকা নেন। বর্তমানে গ্রিস প্রবাসী সুন্দর আলী সমকালকে জানান, তাঁর ভাইকে ইউরোপে পাঠানোর জন্য টাকা দিয়েছিলেন। টাকা উদ্ধারে সজিবের গ্রামের বাড়ি গোয়ালাবাজারে যান। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকেও জানান। কিন্তু কেউই দায়িত্ব নেয়নি। প্রতারক সজিব বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও জিন্দাবাজারের বিডি মেট্রো ট্রাভেলসসহ নগরীর বিভন্ন এলাকায় ১০-১২টি ট্রাভেল এজেন্সি মালিকের বিরুদ্ধে ৩০-৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে টালবাহানা করছেন।
এসব বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, ভিসা দেয় দূতাবাস, কোনো ট্রাভেল এজেন্সি নয়। কিন্তু এক ধরনের প্রতিষ্ঠান ভিসার নামে প্রতারণা করে। তাদের নেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন কিংবা তারা আটাবের সদস্যও নয়। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রয়োজন। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে লোকজন প্রতারণার শিকার হচ্ছে, এটা দুঃখজনক।
মহানগরের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অধিকাংশ মামলা আদালতে করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, কেউ অপরাধ করলে পুলিশকে আগে অবগত করলে তাদের ধরতে সুবিধা হয়। কিন্তু দেখা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠান টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেলে লোকজন আইনি সহায়তার জন্য আসে।
- বিষয় :
- প্রতারক
