ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কান্তজিউ বিগ্রহ যাচ্ছে রাজবাড়িতে

কান্তজিউ বিগ্রহ যাচ্ছে রাজবাড়িতে
×

মন্দির প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছিলেন তিন মাসের জন্য কান্তজিউকে বিদায় জানাতে। শুক্রবার সকালে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে সমকাল

দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৩

শঙ্খ, ঢোল, মন্দিরা, কাড়াসহ নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কয়েক হাজার ভক্ত মন্দির প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছিলেন তিন মাসের জন্য কান্তজিউকে বিদায় জানাতে। ভক্তরা তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে কান্তজিউকে দর্শন করেন। এ অবস্থা ছিল শুক্রবার সকালে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে।
প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ও রাজপরিবারের প্রথা অনুযায়ী প্রতিবছর ভাদ্র মাসের জন্মাষ্টমী তিথির দুই দিন আগে কান্তনগর মন্দির থেকে কান্তজিউ বিগ্রহকে নৌপথে আনা হয় দিনাজপুর শহরের রাজবাড়িতে। তিন মাস সেখানে অবস্থান করার পর রাসপূর্ণিমার এক দিন আগে আবার রথে করে নেওয়া হয় কান্তনগর মন্দিরে। 
এ রীতি অনুযায়ী সকালে কান্তজিউ মন্দির থেকে পূজা-অর্চনা শেষে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হয় পূণর্ভবা নদীর তীরে। সেখান থেকে নৌকায় করে রাতে বিগ্রহ রাজবাড়ির মন্দিরে পৌঁছায়। সকাল থেকেই দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কান্তনগর মন্দিরের পার্শ্ববর্তী পুনর্ভবা নদীর তীরে হাজারো ভক্ত-পুণ্যার্থীর সমাগম। ভক্তরা এসেছেন তাদের ভগবান শ্রী শ্রী কান্তজিউ বিগ্রহ কান্তনগর মন্দির থেকে রাজবাড়িতে নিয়ে যেতে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। 
দিনাজপুর রাজদেবোত্তর এস্টেট সূত্রে জানা যায়, ৫শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুর রাজপরিবারের প্রথা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা ভগবান বিষ্ণুর (নারায়ণ) আরেক রূপ কান্তজিউ বিগ্রহ। এ বিগ্রহ ৯ মাস থাকে কান্তনগর মন্দিরে, ৩ মাস থাকে রাজবাড়িতে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর এক দিন আগে নৌপথে ২৫ কিলোমিটার দূরে নিয়ে আসা হয় রাজবাড়িতে। তিন মাস থাকার পর রাসপূর্ণিমা তিথির দুই দিন আগে আগে আবার কান্তজীউ বিগ্রহ ফেরত যায় তার মন্দিরে। এটিই চিরাচরিত নিয়ম। এই পুরোনা ঐতিহ্য ও রাজপরিবারের প্রথা অনুযায়ী হয়ে আসছে দীর্ঘ ২৭৩ বছর ধরে। অর্থাৎ ১৭৫২ সাল থেকে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দিনাজপুর রাজবংশ সাড়ে ৫শ বছর আগে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেই বংশের রাজা প্রাণনাথ দিনাজপুর শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলার কান্তনগর এলাকায় কান্তজিউ মন্দির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ১৭২২ সালে। এরপর ১৭৫২ সালে এই মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ করেন প্রাণনাথের পোষ্যপুত্র রাজা রামনাথ। সেই সময় থেকেই কান্তজিউ বিগ্রহের এই উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। 
কান্তজিউ বিগ্রহ নৌপথে যাত্রা অনুষ্ঠানে এসেছেন জেলা সদরের নিমনগর এলাকার রিপা রানী। তিনি বলেন, ‘সবার মঙ্গল কামনায়, বিশ্বশান্তি কামনায় আমাদের এখানে আসা। ভগবান সবার মনের ইচ্ছা পূরণ করুক এটিই আমাদের চাওয়া।’ 
রামচন্দ্রপুর এলাকার সুমন রায় বলেন, ‘আমরা এসেছি এই যাত্রা দেখতে। আমাদের এটি প্রাণের উৎসব। এই উৎসবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্ত-পুণ্যার্থীরা আসেন। আমরা পরিবারসহ এসেছি। ভগবানের কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করতে।’ 
দিনাজপুরের রাজবাড়ি এলাকার রনজিৎ কুমার সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটি রাজা-বাদশাদের আমল থেকে এই উৎসব হয়ে আসছে। এটি শত শত বছরের প্রথা ও ঐতিহ্য। এটি একটি বড় ধর্মীয় উৎসব। কান্তনগর মন্দির দেশে ও বিদেশের কাছে পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত। এখানে আসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’ 
কান্তজিউ বিগ্রহ নদীপথে নিয়ে আসা, পূজা-অর্চনা ও ভোগের ব্যবস্থা করে দিনাজপুর রাজদেবোত্তর এস্টেট। এই এস্টেটের কার্যকরী সদস্য ডা. ডিসি রায় বলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক রূপ কান্তজিউ। এই বিগ্রহ ৯ মাস কান্তনগর মন্দিরে থাকে এবং ৩ মাস রাজবাড়িতে থাকে। এই উৎসব হয়ে আসছে ২৭৩ বছর ধরে। 
কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, কান্তজিউ বিগ্রহ শান্তিপূর্ণভাবে যাত্রা শুরু করেছে। নিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। নৌকার সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা রয়েছেন। প্রতিটি ঘাটে এবং নদীতীরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। 
কাহারোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোকলেদা খাতুন মীম বলেন, ‘আয়োজন সুন্দর করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি; যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এই উৎসব উদযাপন করা যায়।’ 

আরও পড়ুন

×