সিলেটের পাথররাজ্য
বিছনাকান্দির লুট হওয়া পাথরেরও হদিস নেই
কেনাবেচায় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও প্রভাবশালীরা জড়িত
.
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৫৫
সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর ও জাফলং পর্যটন কেন্দ্রের মতো লুট হয় পর্যটন কেন্দ্র বিছনাকান্দির পাথরও। অন্য পর্যটন কেন্দ্রের পাথর উদ্ধার করে প্রতিস্থাপন অব্যাহত থাকলেও হদিস মিলছে না বিছনাকান্দির পাথরের। পাথর সরিয়ে কীভাবে নেওয়া হয়েছে, তার তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে। এমনকি এক বছর আগে জব্দ করা বিছনাকান্দির আড়াই লাখ ঘনফুট পাথরও গায়েব হয়ে যায়।
নৌ ও সড়কপথ দিয়ে সম্প্রতি অনেক পাথরই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিছনাকান্দি থেকে ছোট আকারের সব পাথরই লুট হয়ে যাওয়ায় পর্যটকরা পড়েছেন বিড়ম্বনায়। এখন বড় পাথরগুলোর ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে হয় স্রোতধারায়।
গত শনিবার সরেজমিন দেখা গেছে, বড় আকারের পাথর বহনযোগ্য না হওয়ায় শ্রমিকরা তুলে নিতে পারেনি। তবে অনেক বড় পাথর ভেঙে টুকরো করে নেওয়া হয়েছে। পাথর সরানো ও ভেঙে ফেলার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট ভেসে উঠেছে।
দুই ধারে প্রবহমান পানিপ্রবাহ ও তার মাঝখানে ছোট-বড় লাখ লাখ বিছানো পাথরের ওপর হেঁটে আগে পর্যটকরা নামতেন স্রোতধারায়। কিন্তু সরকার পতনের পর এক বছরে বদলে গেছে সেখানকার দৃশ্য। সম্প্রতি লুটের মাত্রা এত বেড়েই যায় যে, স্থানীয় মরকিটিলার সামনের অংশ ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন করা হয়েছে।
সরেজমিন বিছনাকান্দি পর্যটন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে নদীর চরে ১০০ থেকে ২০০ ঘনফুট পাথর বিজিবি শ্রমিকদের দিয়ে বিছাতে দেখা যায়। খনিজ বিভাগের লোকজন সেখানে যাবেন– এই খবরে জায়গার পাথর জায়গায় রাখা হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন।
বিছনাকান্দির অবস্থান গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে। মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের পাদদেশে উমক্রেম নদীর স্রোত মিলিত হয়েছে বিছনাকান্দি নদীতে। সীমান্তঘেঁষা এ কেন্দ্রটির ভূমি প্রায় ৫৩ একরের মধ্যে ১৩ একর পাথর উত্তোলনের জন্য গেজেটভুক্ত। পাথর কোয়ারি ইজারা বাতিল করার পর শুরু হয় পাথর উত্তোলন। গত কয়েক বছরে স্থানীয় আদর্শগ্রাম, বগায়য়া মুসলিমপাড়া, গোচর ও কান্দুবস্তি এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে।
পাথর লুটের তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে
বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি ও পর্যটন কেন্দ্র থেকে কী পরিমাণ পাথর লুট হয়েছে, তার সঠিক তথ্য নেই উপজেলা প্রশাসনের কাছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, এক বছরে ছয়-সাত লাখ ঘনফুট পাথর লুট হয়। ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা কম দামে পাথর কিনে নিয়ে আবার বিক্রি করে দিতেন বিভিন্ন ক্রাশার মিল মালিকসহ পাথর ব্যবসায়ীদের কাছে।
পাথর উত্তোলনে গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবেদিন, সদস্য মো. আব্দুল্লাহ, ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ, স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান আহমদ, কামরুল ইসলাম, আবুল মিয়াসহ ২০-২৫ জন জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, আমি কোনো দিন কোয়ারিতে যাইনি। বিজিবির সহায়তায় শ্রমিকরা চুরি করেছে। আমরা বিভিন্ন সময় বাধা দিয়েছি।
সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবেদিন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে শহরে বাস করছেন। বিছনাকান্দির পাথরের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, বিছনাকান্দির পাথরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। মেম্বার হিসেবে আমার জিম্মায় যে পাথর ছিল তাও চুরি করা হয়েছে। আমি প্রশাসনকে অবগত করেছি।
নিলামের আড়াই লাখ ঘনফুট পাথরও গায়েব
গত বছরের ৩ নভেম্বর উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত টাস্কফোর্স অভিযান চালায় বিছনাকান্দি, স্থানীয় আনফরেরভাঙা ও হাদারপার এলাকায়। সেখান থেকে বিছনাকান্দি পর্যটন কেন্দ্র ও ইজারাবিহীন বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারির লুটের প্রায় আড়াই লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের এ পাথর রাখা হয়েছিল হাদারপার ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন ও বিছনাকান্দি ইউপি সদস্য পাপলু মিয়ার জিম্মায়। গত ২০ ডিসেম্বর খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) পাথর নিলাম আহ্বান করে। ১ থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দরপত্র ও ৮ জানুয়ারি জমাদানের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। কিন্তু নিলাম প্রক্রিয়ার মধ্যে পাথর চুরি হয়ে যায়।
গোয়াইনঘাট থানার ওসি সরকার তোফায়েল আহমদ জানান, বিছনাকান্দির নিলামের পাথর চুরির ঘটনায় মামলার পর পুলিশ তদন্ত করছে। কারা চুরি করেছে, সে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গোয়াইনঘাট ইউএনও রতন কুমার অধিকারী সমকালকে বলেন, বিছনাকান্দি থেকে লুট হওয়া পাথর এখনও উদ্ধার হয়নি। আমরা জাফলং নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি। তবে শিগগির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানকার পাথর লুটে ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে।
- বিষয় :
- পাথরখনি
