ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মধুমতীতে মিলছে না মাছ. জীবিকা সংকটে জেলেরা

মধুমতীতে মিলছে না মাছ. জীবিকা সংকটে জেলেরা
×

ছবি: সংগৃহীত

আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ০২:৪১

ভরা মৌসুমেও ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতী নদীতে চলছে মাছের আকাল। নদী থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। কালেভদ্রে কিছু মাছ জালে আটকালেও দিনশেষে রোজগার পরিশ্রমের তুলনায় অনেক কম। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জেলেদের জীবন-জীবিকা। অধিকাংশ জেলে পরিবারের সংসার চলছে ঋণের টাকায়। আবার অনেক পরিবারের দিন চলছে খুবই কষ্টে।

জেলেদের অভিযোগ, মধুমতী নদীসহ উপজেলার নদী, খাল-বিলে চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জালে সয়লাব হয়ে গেছে। মা মাছ নিধন হয়ে যাচ্ছে খুব সহজে। মাছের কোনো বংশ বিস্তার হচ্ছে না। ভরা মৌসুমেও মাছ না পেয়ে জেলেদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তাঁরা। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন অনেক জেলে। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে দিনমজুরের কাজ করছেন।  

উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় নিবন্ধিত ৮১৭ জন জেলে রয়েছেন; যার মধ্যে ৫৫০ জেলে মধুমতী নদী থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। 

সরেজমিন উপজেলার পবনবেগ মালোপাড়ায় দেখা যায়, জেলেরা কর্মহীন হয়ে বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছেন। নদীতে মাছ না থাকায় জেলেরা জাল বুনে সময় পার করছেন। মালোপাড়ার জেলে বিমল বিশ্বাস ২৮ বছর ধরে মধুমতী নদীতে মাছ ধরেন। তিনি জানান, বড় ফাঁসের জাল দিয়ে ফেলেন নদীতে। গত সাত দিনে ছোট ও মাঝারি সাইজের ৭-৮টি ইলিশ পেয়েছেন। এসব ইলিশ তিনি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তাঁর দলে তিনজন মাঝি রয়েছেন। তারা বাধ্য হয়ে পেশা ছেড়ে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন। আক্ষেপ করে পবন বলেন, এক সময় মধুমতীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত। গত কয়েক বছর নদীতে মাছ তেমন ধরা পড়ে না। এ বছর সব থেকে বেশি খারাপ সময় যাচ্ছে। এখন একটি ইলিশ পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। 

মালোপাড়ার বিধান কুমার বিশ্বাস জানান, নদ-নদী, হাওর-বিলে শৌখিন মাছ শিকারিদের চায়না দুয়ারী জালে ভরে গেছে। জালে আগের মতো আর মাছ ধরা পড়ে না।  

৩৫ বছর ধরে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের টিকরপাড়া গ্রামের নিতাই লাল অধিকারী। তিনি বলেন, ‘ছয়-সাতজন মিলে নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে যে মাছ পাই, তাতে সংসার চলে না। আগে নদীতে জাল ফেললে চাপিলা, টেংরা, বেলে, বাচা মাছসহ দেশি প্রজাতির নানা ধরনের মাছ পাওয়া যেত। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হতো। এখন জাল ফেলে সারা দিন-রাত মিলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মাছ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। দলের প্রত্যেকে গড়ে ৩০০ টাকা করে ভাগে পান। তা দিয়ে সংসার চলে না। দল থেকে ইতোমধ্যে দুজন অন্য পেশায় চলে গেছেন। বাপ-দাদার পেশা বলে এখনও ছাড়তে পারছেন না তিনি। 

উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মাঝিপাড়ার বাসিন্দা সদানন্দ বিশ্বাস বলেন, ‘দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি নদীতে মাছ ধরছেন। ভরা মৌসুমে এমন আকাল কখনও হয়নি। আগে তিনি মধুমতীর শাখা বারাশিয়া নদীতে ভেসাল জাল দিয়ে টেংরা, পুঁটি, কই, শিংসহ নানা প্রজাতির মাছ শিকার করতেন। এখন ভেসালে দেশি প্রজাতির মাছ তেমন পাওয়া যায় না। চাষের তেলাপিয়া, সিলভার কার্পসহ কম দামি কিছু মাছ ওঠে। পাট জাগ দেওয়ার কারণে বারাশিয়া নদীর পানি পচে গেছে। বর্তমানে বারাশিয়া নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। এখন পুকুরের চাষের মাছ বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। 

সুনীল, অসীম, শ্যামল নামে কয়েকজন জেলে জানান, মধুমতী নদীতে সারারাত জাল ফেলে যে মাছ পান তাতে অনেক সময় নৌকার জ্বালানি তেল ও জালের খরচ ওঠে না। চাল-ডালসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের যে হারে দাম বেড়েছে তাতে সংসার চলছে না। অনেকে পরিবারকে বাঁচানোর জন্য বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। 

গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খান সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার নদীতে জেলেদের জালে খুবই কম মাছ ধরা পড়ছে। এ জন্য জেলেদের খুব দুর্দিন যাচ্ছে। তাঁরা সহায়তা পেতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ না আসায় তাদের সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। 

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ বসু বলেন, এক ধরনের অসাধু মৎস্য শিকারি নদীতে চায়না দুয়ারী, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এতে মাছের বংশ বিস্তারও হচ্ছে না। ভরা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা না পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন উপজেলার  পাঁচ শতাধিক জেলে। এতে জেলেদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। 

আরও পড়ুন

×