ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

নানা সংকটে মাধবপুরের চা শিল্প

নানা সংকটে মাধবপুরের চা শিল্প
×

মাধবপুরের জগদীশপুর চা বাগান থেকে পাতা সংগ্রহ করে কারখানায় নিচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। রোববারের ছবি -সমকাল

 মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪২

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার উল্লেখযোগ্য পাঁচটি চা বাগান দেশের চা শিল্প খাতের মোট উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ সেখানে গত কয়েক বছর ধরে নানা সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে 
এই খাতকে।

এই পাঁচটি চা বাগান হলো– জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, বৈকুণ্ঠপুর ও সুরমা চা বাগান। এর প্রায় প্রতিটি বাগান প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চায়ের উৎপাদন কমে যাওয়া, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক মন্দা, বাজারমূল্যে ধস, বৈরী প্রকৃতিসহ নানা কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

কয়েক বছর ধরে এনটিসির জগদীশপুর ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানে লোকসান হচ্ছেই। পাঁচ বছর থেকে সিন্ডিকেটের কারণে নিলাম বাজারে চায়ের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্রমাগত লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে।

চা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সময়ের অনিয়মগুলোর ভোগান্তি বইতে হচ্ছে তাদের। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে চা বাগানগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে অর্থ সংকটে নোয়াপাড়া চা বাগানের কারখানা তিন বছর ধরে বন্ধ। বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানে গত ১০ বছর প্রায় কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের ডেপুটি ম্যানেজার সোহাগ মাহমুদ জানান, বাগানগুলোর আর্থিক সংকট দূরীকরণে চার থেকে পাঁচ ভাগ হারে ব্যাংক ঋণ প্রদানসহ নানা অসুবিধা দূরীকরণে বাগান মালিকরা চা সংসদদের চেয়ারম্যানের পদক্ষেপ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তারা চা শিল্পকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত, সিলেটে একটি নিলাম কেন্দ্র স্থাপন, চা বেশি পরিমাণে রপ্তানি, চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগসহ ১২টি প্রস্তাবনা চা সংসদের চেয়ারম্যান বরাবর উত্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে তারা উত্তরাঞ্চলে মান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চায়ের উৎপাদনে চায়ের দর পতনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছেন চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে।

বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের ম্যানেজার শামসুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চা বাগানের ফসলের পরিমাণ কমে যাওয়া, গুণগত মানে বিঘ্ন ঘটা, উৎপাদনের অস্থিরতা প্রভৃতি পরিবর্তন সরাসরি দৃশ্যমান। চা গাছের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারা, নানা রোগ ও পোকামাকড়ের প্রকোপ বাড়ার কারণে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ ও নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ অপরিহার্য। এ ছাড়া চা শ্রমিকদের রেশন, বেতন-ভাতা প্রদানসহ নানা বিষয়ে বাগান মালিকরা সংকটে রয়েছেন। সুরমা চা বাগানের সিনিয়র সহকারী ম্যানেজার মিরন হোসেন জানান, এ বছর চায়ের উৎপাদন অনেক কমে গেছে, কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়েছে। চা বাগান এখন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বল্প সুদে সরকার ব্যাংক ঋণ দিলে বাগান বাঁচিয়ে রাখা যাবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বাচাশ্রই) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, চা শুধু একটি জনপ্রিয় পানীয় নয়; এটি বাংলাদেশের লাখো কৃষক-শ্রমিকের জীবিকা ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চা শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী, যারা তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই শ্রমিকদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, চা শ্রমিকরা ভূমি অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩২ ধারার (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো শ্রমিকের চাকরির অবসান হলে তা যে কোনোভাবে হোক না কেন, তিনি চাকরির অবসানের ৬০ দিনের মধ্যে মালিক কর্তৃক বরাদ্দ করা বাসস্থান ছেড়ে দেবেন।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের চা শ্রমিকদের দাবি, দেশের নিবন্ধিত ১৬৭টি চা বাগানের যে সোয়া লাখ চা শ্রমিক রয়েছে তার সঙ্গে অন্য শ্রমিকদের এক করে দেখার অদূরদর্শিতায় ভূমি অধিকারের মতো রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রায় ২০০ বছরেও চা শ্রমিকদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের সঙ্গে দেশের মূল সমাজের সংযোগ সামান্য। চা বাগানের বাইরে অচেনা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তাদের চা বাগানের পরিবেশেই আটকে থাকতে হয়। তারপরও চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নেই।

সিনিয়র টি-প্লান্টার এবং বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ প্রতিনিধি ইবাদুল হক বলেন, সরকার নিলাম মূল্য প্রতি কেজি চা ২৪৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও সিন্ডিকেটের তৎপরতায় বাগান মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে শঙ্কিত। এ অবস্থায় চায়ের কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া না গেলে চায়ে লোকসান বাড়বে। দেশের চা বাগানগুলো আদৌ টিকে থাকবে কিনা, সন্দেহ আছে।  
তিনি বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। একই সময়ে চায়ের দর বেড়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। দামের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চা শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা কমেছে। তাই চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ২৫০ টাকায় উন্নীত করতে হবে।  

আরও পড়ুন

×