ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

কীভাবে হবে চাকসুর ভোট গণনা, এক নজরে খুঁটিনাটি

কীভাবে হবে চাকসুর ভোট গণনা, এক নজরে খুঁটিনাটি
×

চাকসু নির্বাচনে চলছে ভোটগ্রহণ। বুধবার সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ছবি: সমকাল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৩২ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে। প্রায় ৩৫ বছর পর হওয়া নির্বাচনে মোট ভোটার সাড়ে ২৭ হাজার, প্রার্থী ৯০৭ জন।

গত মাসে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর ফলাফল ঘোষণায় দীর্ঘ সময় লাগে। ডাকসুতে গভীর রাতে প্রকাশ হলেও জাকসুর ফলাফল ঘোষণায় লাগে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা। প্রায় ৩৯ হাজার ভোটার ছিল ডাকসুতে, জাকসুতে ছিল প্রায় ১২ হাজার।

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চার বছর পর ১৯৭০ সালে প্রথম চাকসু নির্বাচন হয়। প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও এতদিনে মাত্র ছয়বার হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ বিরতির পর এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে গণনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেভাবে হবে ভোট গণনা
চাকসুর ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা বিকেল চারটায়। এরপর দুই ধাপে হবে গণনা। একটি ধাপ পরিচালনা করবে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান এবং অন্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেল। ভোট শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে তাৎক্ষণিকভাবে গণনা করা হবে।

ক্যাম্পাসে ভোটগ্রহণ হচ্ছে মোট ছয়টি কেন্দ্রে। একটি কেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা। প্রতিটি ভোটার চারটি ব্যালট পেপারে মোট ৪০টি ভোট দিচ্ছেন। এর মধ্যে ২৬টি কেন্দ্রীয় ও ১৪টি হল সংসদের। ব্যালট পেপারে ভোটারকে প্রার্থীর নামের বিপরীতে বৃত্ত ভরাট করতে হচ্ছে। অনেকটা বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ -এর মতো।

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের সঙ্গে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন সহউপাচার্য কামাল উদ্দিন (প্রশাসন)। বিজ্ঞান অনুষদের সামনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অযথা সময় নষ্ট হবে না। ভোটগণনা হবে ওএমআরে।

ওএমআর যন্ত্রের নমুনা। প্রতীকী ছবি

ভোট গণনার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে একটি করে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) যন্ত্র আছে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা পরীক্ষার উত্তরপত্র বা জরিপের ফরমের মতো নথি থেকে মানুষের হাতে পূরণ করা তথ্য শনাক্ত ও সংগ্রহ করে। এই প্রক্রিয়ায় কাগজের ফরম স্ক্যান করা হয়, আলো ফেলা হয় এবং প্রতিটি স্থানের প্রতিফলিত আলোর পরিমাণ পরিমাপ করে নির্ধারণ করা হয় কোন বৃত্ত বা ঘর পূরণ করা হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হয়।

কেন্দ্র ও হলের ব্যালট পেপার ওএমআর-এ পৃথকভাবে দেওয়া হবে। প্রতিটি কেন্দ্র থেকেই ফলাফল ঘোষণা করা হবে। সব কেন্দ্রের ফল পাওয়ার পর ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ মিলনায়তনে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

কত পদ, যত প্রার্থী
মোট ১৩টি প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় সংসদে মোট পদ ২৬টি, প্রার্থী ৪১৪ জন। ১৪টি হলের প্রতিটিতে পদ ১৪টি করে ও একটি হোস্টেলে ১০টি পদ। মোট ২০৬টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ৪৯৩ জন। 

কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) পদে ২৪, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ২২ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ২২ জন। মোট ২৭ হাজার ৫১৬ ভোটারের মধ্যে ছাত্রী ১১ হাজার ১৫৬ জন, প্রায় ৪০ শতাংশ। সুতরাং কোনও প্রার্থীর জয়ের ক্ষেত্রে ছাত্রীদের ভোট বড় ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা
বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। হাজারও শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিরো পয়েন্ট’। ভোট দেওয়ার পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি। সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছবি: সমকাল

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিয়া তনি বলেন, আজকের দিনটির জন্য আমরা অনেক বছর অপেক্ষায় ছিলাম। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে তাই প্রবল আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে এসেছি। অনেকের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে অনেক ভালো লাগছে।

নির্বাচন কেন্দ্র করে চার স্তরের নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো হয়েছে পুরো ক্যাম্পাস। পুলিশ, র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় এক হাজার ২০০ সদস্য দায়িত্বে আছেন। 

কিছু অভিযোগ
প্রকৌশল অনুষদের ২১৪ নম্বর কক্ষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই ভোট গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। সকালে এমন অভিযোগ তোলেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বরত কয়েকজন পোলিং এজেন্ট। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট মোহাম্মদ শামিম উদ্দীন বলেন, অন্তত ২০ জন ভোটার প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়া ব্যালট বাক্সে ভোট দিয়েছেন। 

ভোটগ্রহণের সময় অমোচনীয় কালি না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী শাফায়েত হোসেন। তিনি বলেন, ভোটারদের হাতে যে কালি ব্যবহার করা হচ্ছে তা সহজেই মোচনীয়। ওই কালি হাত দিয়ে ধরতেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে যাচ্ছে। একজন ভোটার কালি মুছে আবারও ভোট দিতে পারবে।

এমন অভিযোগের ব্যাখ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য সাধারণত জার্মানি থেকে অমোচনীয় কালি আনা হয়। নির্বাচনের পরে তা আবার ধ্বংসও করা হয়। ফলে অমোচনীয় কালি পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। এখন ভোটারদের আঙুলে সাধারণ মার্কার দিয়ে দাগ দেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে না। কারণ, কয়েক ধাপে ভোটারদের পরিচয় শনাক্ত করা হচ্ছে।

অমোচনীয় কালি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মনির উদ্দিন। ছবি: সমকাল

এদিকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ভোটের আগে প্রশাসন ব্রেইল ব্যালট ও শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা রাখার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি।

ফলাফল নির্ধারণের ‘ফ্যাক্টর’
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের প্যানেলের প্রার্থীদের জয়জয়কার দেখা গেছে। এর মধ্যে ডাকসুতে ভিপি, জিএস ও এজিএস এবং ১২টি সম্পাদক পদের মধ্যে ৯টিতে জয় পান শিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা। জাকসুর ২৫ পদের মধ্যে জিএস ও এজিএসসহ ২০টি পদে জয় পান শিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থীরা।

চাকসু নির্বাচনের প্রচার চলার সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের সহকর্মীরা জানিয়েছিলেন, আবাসিক হলে আধিপত্য, ভোটের কৌশলে এগিয়ে থাকায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির প্যানেলের মধ্যে মূল লড়াই হতে পারে। ছাত্রদের ৯ হলের ছয়টিতে শিবির, তিনটিতে ছাত্রদলের প্রাধান্য আছে। ছাত্রীদের ৬টি হলেও জোর চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। ৪০ শতাংশ ছাত্রী ভোটের দিকে চোখ ছাত্রদল ও শিবিরের। এসব ভোট ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

প্রার্থীরা যা বলছেন
ভোট দেওয়ার পর ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, শিক্ষার্থীরা যে রায় দেবেন তা মেনে নেব। জয়-পরাজয় যেটিই হোক, আমরা অতীতে যেভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম সেভাবেই থাকব। 

ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (বাসদ) সমন্বয়ে গঠিত ‘দ্রোহ পর্ষদ’- এর ভিপি প্রার্থী ঋজু লক্ষ্মী সকালে ভোট দেওয়ার পর বলেন, ভোটারদের উপস্থিতি কম। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সারা দিন একই পরিস্থিতি থাকুক, এটিই প্রত্যাশা।

(তথ্য নেওয়া হয়েছে সহকর্মী তৌফিকুল ইসলাম বাবর, আব্দুল্লাহ আল মামুন, শৈবাল আচার্য্য ও মেহেদী হাসান এর পাঠানো প্রতিবেদন থেকে। গ্রন্থনা- সাদিকুর রহমান

আরও পড়ুন

×