‘ঝাই’ বিক্রি করে জীবিকা
নকলার পেকুয়া বিলে ভেসে থাকা ঝাই বিক্রির জন্য সংগ্রহ করছেন জেলেরা সমকাল
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৪ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক সময় যে বিলে মাছ ধরে জীবিকা জুটত শত শত মানুষের। কালক্রমে সেই বিলে মাছ শিকারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল ‘ঝাই’ (ভাসমান জলজ উদ্ভিদ)। এই জঞ্জালগুলোই এখন অনেক পরিবারের জন্য আশীর্বাদ। শেরপুরের নকলা উপজেলার গণপদ্দি এলাকার পেকুয়া বিলের ‘ঝাই’ সংগ্রহ করেই জীবিকা জুটছে প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের।
পেকুয়া বিল বিস্তীর্ণ এলাকা ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত। ২১৯ একর আয়তনের বিলের বেশির ভাগ অংশই ঢেকে রেখেছে ঝাই। এক সময় বিলের জন্য অভিশাপ ছিল ঝাই, যা মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করত। ব্যাহত করত মাছের প্রজননও। জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারতেন না জেলেরা। এখন এটিই জেলে পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস।
মৎস্য চাষিরা জানান, ঝাই ভাসমান সবুজ জলজ উদ্ভিদ। এটি বিল বা খালের পানির ওপর চাদরের মতো ভেসে থাকে। অনেক এলাকায় ‘তরুলতা’ অথবা ‘জলঢাকনা’ নামেও পরিচিত। রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া মাছের খাদ্য ঝাই। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় বলে এটি মাছের সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
পেকুয়া বিলপাড়ের বাসিন্দা সানি ইসলামের ভাষ্য, দশ বছর ধরে এই ঝাই সংগ্রহ করছেন তিনি। তার দিন শুরু হয় ফজর নামাজের পর। তিনি তার ছোট ডিঙি নিয়ে বিলে ভাড়া নেওয়া জায়গায় চলে যান। তিনি বলেন, ‘সকাল বেলা ঝাই নরম থাকে, তুলতে সুবিধা হয়। বাঁশ দিয়ে ঝাই তুলে নৌকায় ভরে নিই। তারপর সেগুলো বিলের কিনারায় এনে স্তুপ করে রেখে বিক্রি করি।’
একই এলাকার আব্দুর রহিম জানান, এক বেলায় দুজন মিলে প্রায় পাঁচ ভ্যান পর্যন্ত ঝাই তুলতে পারেন তারা। প্রতি নৌকা ঝাই বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। দুই বেলায় আয় হয় দুই হাজার টাকা; যা দিয়ে এখন সংসার ভালোই চলছে।
ঝাইয়ের ক্রেতা মাছচাষি মনির বলেন, ‘এই বিল থেকে আমরা ঝাই কিনে আনি। দুই ভ্যান ঝাই দিলে ৬টি পুকুরের দুই সপ্তাহ মাছের খাবার হয়। তাই এখন ফিড (প্রক্রিয়াজত মাছের খাদ্য) কম লাগে।’
মাছচাষি শফি উদ্দিন জানান, আগে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকার মাছের ফিড কিনতে হতো। এখন দুই ভ্যান ঝাই দিলেই সেই চাহিদা পূরণ হয়। এতে খরচ অনেকটা কমে গেছে। সহজে ঝাইও পাওয়া যাচ্ছে।
কৈয়ার বাজারের বাসিন্দা বরুণ চৌধুরীর ভাষ্য, এক সময় ঝাই এতটাই ছেয়ে গিয়েছিল যে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার নতুন দিগন্ত খুলে গেছে।
নকলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান জানান, ঝাই সংগ্রহে যেমন মাছের খরচ কমছে, তেমনি বিলের অতিরিক্ত উদ্ভিদ অপসারণ হওয়ায় জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও ফিরছে।
- বিষয় :
- জীবিকা
- নালিতাবাড়ী
- শেরপুর
