ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষক

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষক
×

সাইফুর রহমান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২০ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বিরোধিতাকারীদের বিচার কার্যক্রম ঝুলে আছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে। মুখে মুখে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীপন্থি শিক্ষকরা বিচারের দাবি জানালেও তদন্তের ভার নিতে রাজি হচ্ছেন না কেউই। এমনকি তদন্ত কমিটিকেও তারা তেমন সহায়তা করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে উপাচার্য অনুরোধ করলেও তারা তদন্ত কমিটিতে থাকতে রাজি হননি। এ নিয়ে উপাচার্য দফায় দফায় শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসার পর বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রেখে কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের পদ দেওয়া হয়েছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে। তবে তারাও কাজ শুরু করতে পারেননি। অপারগতা প্রকাশ করে কমিটির আহ্বায়কসহ তিন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। অন্য সদস্যরা কাজ করা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন।

কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলে ‘টার্গেট’ হওয়ার আশঙ্কায় অনেক শিক্ষক দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না। এমনকি তারা মনে করছেন, এই কাজে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে পেশাগত ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। এর পাশাপাশি অনেক শিক্ষক তাদের ঘনিষ্ঠ অভিযুক্ত শিক্ষকদের বাঁচাতেও এমন আচরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘জুলাই-আগস্ট বিপ্লববিরোধী’ শনাক্ত করতে চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে। এতে আহ্বায়ক করা হয় আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার হোসেনকে। সদস্য সচিব ছিলেন বিএনসিসি অফিসের উপরেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মজুমদার। সদস্য ছিলেন আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল গফুর গাজী ও বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিন্নাতুল করিম।

৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। তবে সময় বাড়িয়ে ১৩ আগস্ট তারা উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে ১৯ জন শিক্ষক, ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৩৩ শিক্ষার্থীর (ছাত্রলীগের নেতাকর্মী) নাম উল্লেখ করে তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ আগস্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

এই প্রতিবেদনের আলোকে ৩০ অক্টোবর ২৭১তম সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত, ৩৩ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর মধ্যে নিয়মিতদের বহিষ্কার ও একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়া ব্যক্তিদের সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। তাদের শাস্তি নির্ধারণে রিভিউ কমিটি গঠনে উপাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে কমিটিসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কার্যক্রম শুরুর পর শিক্ষকদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা কিছু তথ্যপ্রমাণ জমা দিয়েছেন। এর বাইরে কমিটি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে। 

রিভিউ কমিটি থেকে পদত্যাগ
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর বিএনপি ও জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি জুলাইবিরোধী শিক্ষক কর্মকর্তাদের তালিকা পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ ও কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়– এ বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলেন তারা। সবাই বিচারের দাবি জানালেও বিপত্তি বাধে রিভিউ কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে। এ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কয়েক দফায় মিটিংয়ে বসেন উপাচার্য। উপাচার্য সংগঠনগুলোর জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানালেও তারা রাজি হননি। তারা সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পদে থাকা শিক্ষকরা ‘তাদের নিয়ে গঠিত কমিটির বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে’ এমন কারণ দেখিয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন। এভাবেই দীর্ঘদিন কমিটি গঠনের বিষয়টি ঝুলে থাকে।

পরে দুই শিক্ষক সংগঠন উপাচার্যের কাছে একটি কমিটির রূপরেখা পেশ করে, যেখানে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে আহ্বায়ক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে উপাচার্য সেই রূপরেখার আলোকেই ২৩ নভেম্বর রিভিউ কমিটি গঠন করেন।

ওই কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. পারভেজ আজহারুল হককে। অন্য সদস্যরা হলেন ইবির আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. জাকির হুসাইন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সিনা, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জালাল উদ্দিন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. জাফর উল্লাহ তালুকদার।

ইতোমধ্যে কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াতপন্থি দুই শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবু সিনা, অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান পদত্যাগ করেছেন। তাদের দুজন শারীরিক অসুস্থতা ও একজন ব্যস্ততার কারণ দেখিয়েছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা পদত্যাগ না করলেও কমিটিতে কাজ করা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। তাদের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও ৯ দিনেও কোনো কাজ হয়নি।

যা বলছেন শিক্ষকরা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপকের অভিযোগ, বিগত সময়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থি অনেক শিক্ষক আওয়ামীপন্থিদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এখন তারাও আওয়ামীপন্থিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া ও বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন। তাঁর ভাষ্য, একজন শিক্ষকও কমিটিকে কোনো তথ্য দেননি। অনেকেই মুখে মুখে নাম বললেও লিখিত কিছু দিতে রাজি হননি। তথ্য-উপাত্তের অভাবে অনেক প্রভাবশালীর নাম বাদ গেছে। শিক্ষকদের দায়িত্ব না নিতে চাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, এর পেছনে ভয় ও রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ দুটোই কাজ করছে। অনেকের ক্ষেত্রে নিজেদের ঘনিষ্ঠদের বাঁচানোর কারণও অবাস্তব কিছু নয়।

ইবি জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান খান বলেন, মানসিকভাবে সবাই চান বিচার হোক। কিন্তু শিক্ষকরা এটাকে একটা ঝামেলা মনে করছে। একই বিভাগে, একই সমাজে প্রতিদিন দেখা হচ্ছে, মিটিং করছেন, একসঙ্গে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেওয়া মানে তাদেরকে চিরজীবনের শত্রু বানানো। ঝুঁকি নিয়ে কেউ কাজ করলেও দেখা গেল প্রশাসন দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না। তখনতো রিপোর্টদাতার অবস্থান আরও বিপজ্জনক হয়ে যায়। তাই এই কাজগুলো শিক্ষকদের দিয়ে না করিয়ে বাইরের সংস্থা দিয়ে করানো প্রয়োজন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহের ভাষ্য, ‘সব শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেই কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছি। কেউ রাজি হননি।’ তিনি বলেন, শিক্ষকরা শুধু মুখে বিচার চান, কিন্তু কমিটিতে থেকে রিস্ক নিতে চান না। পদত্যাগ করা শেষে যে কয়েকজন কমিটিতে থাকবেন, তাদের দিয়েই কাজ করতে হবে। ফ্যাসিস্টদের বিচার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ না। যারা জুলাই চেতনা লালন করেন, তাদের দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে হয় না। নিজেরাই উদ্ধুদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসেন।

আরও পড়ুন

×