ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মুক্তমঞ্চে ভেন্ডার-মাদকাসক্তরা ধুলায় ধুসর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

মুক্তমঞ্চে ভেন্ডার-মাদকাসক্তরা ধুলায় ধুসর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
×

সিরাজগঞ্জের বাজার স্টেশন এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ মির্জা মুক্তমঞ্চের ভগ্নদশা সমকাল

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজগঞ্জ শহরের বাজার স্টেশনে তৈরি মুক্তির সোপান, বিজয় স্মৃতিসৌধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মির্জা ও আব্দুর রউফ পাতার নামে দুটি মুক্তমঞ্চ এখন অবহেলায় পরিত্যক্ত। শহীদদের স্মৃতিবাহী এসব স্থাপনায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ভাঙা প্রাচীর, নেশাখোরদের আড্ডা— সব মিলিয়ে পরিবেশ একেবারে নাজুক হয়ে পড়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, কালেক্টরেট স্কুলের দেয়ালে থাকা ‘ঐতিহ্যের দেয়াল’-এ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, সুকান্তসহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের দেয়ালচিত্র বিকৃত হয়ে গেছে। 
দক্ষিণ পাশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর স্টিলের পাতও চুরি হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ১৫ মাস ধরে এসব স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণহীন।

অবৈধ যানবাহনের দখলে চলে গেছে স্মৃতিসৌধ এলাকা। প্রতিদিন শতাধিক অটোরিকশা, মাইক্রোবাস আর প্রাইভেটকার স্মৃতিসৌধের চারপাশ দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড বানিয়েছে। পৌরসভার নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকলেও প্রতিবছর অর্ধকোটি টাকার বেশি টোল আদায় করা হচ্ছে, যা চালকদের মাঝে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
স্মৃতিসৌধের আশপাশ দখল করেছে ফল বিক্রেতা, চায়ের দোকান ও ছিন্নমূল মানুষের ঝুপড়ি। বর্জ্যের স্তূপ, প্রস্রাব-পায়খানায় পুরো এলাকা নোংরা হয়ে আছে। নতুন ঢাকা রোডে ঢাকাগামী ছয়টি বাস কাউন্টার যত্রতত্র যাত্রী তোলায় যানজট লেগেই থাকে।
২০০৯ সালে নির্মিত লতিফ মির্জা মুক্তমঞ্চের স্টিলের বেষ্টনী ভেঙে গেছে; নামফলক নেই। এর চারদিকে ফল ব্যবসায়ী, রিকশার সারি ও ছিন্নমূল মানুষ। রিকশার ধাক্কায় টাইলস ভেঙে গেছে। মঞ্চের পেছনে দোকানিদের আবর্জনা। স্বাধীনতা স্কয়ার থেকে নাম বদলে তৈরি হওয়া ‘আব্দুর রউফ পাতা মুক্তমঞ্চ’ একই দুরবস্থার শিকার। বেষ্টনীর স্টিল খোয়া গেছে; ভেতরে পরিবহন শ্রমিকদের মাদক সেবন চলছে প্রকাশ্যে। মঞ্চের প্রধান ফটকে ১৫ মাস ধরে ‘রাজাকার’ লেখা অপরিবর্তিত।

বিজয় সৌধ ও মুক্তির সোপান অবহেলায়
৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিজয় সৌধ শুরুর দিকেই মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারের দখল ছিল। এখন ভেতরে প্রবেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়ানো স্বাভাবিক ব্যাপার। ২০১২ সালে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ‘মুক্তির সোপান’-এর স্টিল স্ট্রাকচার আন্দোলনের সময় চুরি হয়ে যায়। ভেতর-বাইরে অটোরিকশা-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড, ঝুপড়ি দোকান গড়ে উঠেছে। রাতে নেশাখোরদের আড্ডা, দিনে গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণে পুরো এলাকা অরক্ষিত। ‘জুলাই ৩৬’ স্মৃতিস্তম্ভ ও ১০ যোদ্ধার স্মরণে রোপিত গাছগুলোও অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে।
সাবেক ডেপুটি কমান্ডার জগলুল হক চৌধুরী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান যেমন কমেছে, তেমনি স্মৃতিসৌধগুলোর অবস্থাও করুণ। মঞ্চগুলো ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
সিএনজি অটোরিকশা মালিক গ্রুপের সুপারভাইজার আলী জোয়ার্দার জানান, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই এলাকায় অবস্থান করছেন। অথচ পৌরসভা প্রতিদিন টোল নিচ্ছে।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, নতুন স্ট্যান্ডের জায়গা খোঁজা হচ্ছে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

পৌর প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) শাহাদাত হোসেন জানান, ‘কয়েকটি উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই সমাধান হবে।
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বাজার স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সদর থানার বিদায়ী ওসি মোখলেসুর রহমান অবাক হয়ে বলেন, ‘পাতা মুক্তমঞ্চ কোথায়, চিনতে পারছি না।’
সিরাজগঞ্জ জেলা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (অ্যাডমিন) মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম বলেন, আমাদের একার পক্ষে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তবে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দরকার হলে প্রস্তুত থাকব।

আরও পড়ুন

×