ভোটের আগে রাউজানে হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক
চট্টগ্রামের রাউজানের পৌর এলাকায় গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিলে সবকিছু পুড়ে যায় সমকাল
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫২ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই চট্টগ্রামের রাউজানে হাজির হয়েছে নতুন এক আতঙ্ক। ভেতরে মানুষ রেখে বাইরের দরজায় তালা মেরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে মধ্যরাতে। এমন ঘটনা ঘটছে একের পর এক। ৫০ দিনের ব্যবধানে রাউজানের ১২টি ঘরে লাগানো হয়েছে এমন আগুন। যাদের ঘরে এভাবে আগুন লাগানো হচ্ছে, তাদের সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
একসঙ্গে কয়েকটি ঘর আছে– এমন বাড়িই বেছে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। মামলার ঝামেলা এড়াতে নিম্নবিত্ত হিন্দুদের ঘরেই দেওয়া হচ্ছে এমন আগুন। সংখ্যালঘু ভোটারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতেই এই আগুন দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজন। রাউজানে সাড়ে চার লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজারই হিন্দু ভোটার।
রাউজানের স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, ভোট বানচাল করতে এবং ভোটের আগে আতঙ্ক তৈরি করে এলাকাছাড়া করতেই এভাবে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন লাগাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। ভোট যত কাছে আসবে, এমন ঘটনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, জাতীয় নির্বাচন এলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বেড়ে যেত অতীতেও। তবে এবারের মতো এত বেশি ঘরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা দেখা যায়নি অতীতে কখনও। ২০০৩ সালে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় বাঁশখালীতে রাতের আঁধারে ১১ হিন্দু সদস্যকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। সেটির বিচার শেষ হয়নি ২২ বছরেও। রাউজানে ১২টি পরিবারের ৫২ সদস্যকে বাইরে তালা মেরে আগুন দেওয়া হলেও এখানেও জড়িতদের গ্রেপ্তারে নেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি। দুটি ঘটনায় মামলা হলেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী পরিবারের আস্থা নেই সেটিতেও। প্রশ্ন আছে আমাদের প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়েও।
উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও
রাউজানে একের পর এক হিন্দু ঘরে দুর্বৃত্তদের আগুন দেওয়ার এমন ঘটনায় উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। এরই মধ্যে কয়েকটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নজির আহমদ খান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার সিরাজুল ইসলাম, বেলায়েত হোসেন এবং ওসি সাজেদুল ইসলাম।
গত শনিবার রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, একের পর এক এমন ঘটনা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। সব ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কারা এটির সঙ্গে যুক্ত, সেটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। দুর্বৃত্তদের হাতেনাতে ধরতে সর্বদলীয় কমিটি গঠন করতে বলেছি থানাকে। তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দারা।
নেপথ্যে সংখ্যালঘু ভোট
রাউজানে ভোটার আছে চার লাখ ৮৮ হাজার ৫৮৫ জন। এ উপজেলায় প্রায় ৯৫ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে। সংসদ সদস্য হিসেবে কোন প্রার্থী বিজয়ী হবে, তা নির্ভর করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে এই সংখ্যালঘু ভোট।
রাউজান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রকর চাকমা বলেন, মোট ভোটারের মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটারের আলাদা হিসাব নেই। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু হিসেবে ভোটার তালিকা প্রণয়ন হয় না। সবাই বাংলাদেশি হিসেবে ভোটার তালিকা করা হয়। তবে ধারণা করে রাজনীতিবিদরা একটা হিসাব রাখেন।
জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে একের পর এক আগুন
‘রাতের খাবার খেয়ে পরিবারের সব সদস্য ঘুমিয়ে পড়ে। আগুনের তাপে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় সবার। ঘর থেকে বের হতে দরজা খুলতে চাইলে দেখি বাইরে থেকে সেটি বন্ধ। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় টিনের বেড়া কেটে বিকল্প পথে বের হয়ে কোনোভাবে প্রাণ রক্ষা করি সবাই। জীবন্ত পুড়ে মারতেই এভাবে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।’
গত ১৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার দুঃসহ স্মৃতি এভাবেই বললেন বাবুল দাশ। একই রাতে একই কায়দায় আগুন দেওয়া হয় তাঁর পাশে থাকা প্রিতম তালুকদার ও বিমল তালুকদারের ঘরেও। এ ঘটনা ঘটে ঢেউয়াপাড়া সুরেশ বিদ্যায়তনের উত্তর পাশে তেজেন্দ্র শীলের বাড়িতে। তিনটি বাড়িরই অবস্থান রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে।
টার্গেট করা হচ্ছে পাশাপাশি বাড়ি
স্থানীয় বাসিন্দা ৮ নম্বর ইউনিয়নের কেউটিয়া গ্রামের সুবীর পাল জানান, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা পাশাপাশি অবস্থানে থাকা কয়েকটি ঘরে একসঙ্গে তালা মেরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। এভাবে চার ভাইয়ের পুরো পরিবারকে আগুনে পুড়ে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে তারা। এ জন্য তারা লক্ষ্মী পাল, অধীর পাল, টুনটু পাল ও পরান পালের ঘরে বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে।
পরিবারের লোকজন দুর্বৃত্তদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ দেখে। এরপর তারা চিৎকার শুরু করলে পাড়ার লোকজন ঘরের বাইরের তালা ভেঙে তাদের উদ্ধার করে।
একই গ্রামের বড়ুয়াপাড়ায় সাধন বড়ুয়ার বসতঘরেও বাইরে থেকে তালা দিয়ে রান্নাঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় সাধন বড়ুয়া বিকল্প দরজা দিয়ে ঘর থেকে বের হন। তিনি গোয়ালঘরে থাকা গরুর গলার রশি কেটে দিয়ে সেগুলোকে রক্ষা করতে পারলেও রান্নাঘর ও গোয়ালঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
যেভাবে বেঁচেছে ৫২ প্রাণ
রাউজানে ১ নভেম্বর শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাইরে থেকে হুক লাগিয়ে উপজেলার ডাবুয়া ইউনিয়নের কলমপতি গ্রামের হিমাংশু কবিরাজ বাড়ির শিপন দে ও একই গ্রামের মাস্টার অরুণ মুহুরি বাড়ির মাস্টার মৃদুল মুহুরির বসতঘরে আগুন দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। সেদিন এ দুই পরিবারের ৯ জন আটকা পড়েছিল ঘরের ভেতর।
এ ঘটনার মধ্যদিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টার সূত্রপাত। এ বিষয়ে রাউজান থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিপন দে। ২ নভেম্বর রাউজান পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতানপুর এলাকায় বিকাশ বড়ুয়ার চায়ের দোকানে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। দোকানটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ২৮ নভেম্বর উপজেলার চিকদাইর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে দুই সংখ্যালঘু পরিবারে বাইরে থেকে হুক লাগিয়ে আগুন দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। এ সময় পরিবারের সাতজন আটকা পড়ে ঘরের ভেতর। গত ১৮ ডিসেম্বর রাউজান সদর ইউনিয়নের কেউটিয়া এলাকার পাশাপাশি হিন্দু ও বড়ুয়াপাড়ায় দুর্বৃত্তরা ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আগুন দেয়। এ আগুন দেওয়ার ঘটনায় পাঁচটি বসতঘর পুড়ে যায়। এ ঘটনায় ঘরের ভেতর আটকা পড়ে পরিবারের ১৬ সদস্য। বিকল্প উপায়ে বের না হলে জীবন্ত পুড়ে মরত তাদের সবাই।
১৯ ডিসেম্বর পৌর এলাকার ৮ নম্বর ওয়াডের্র ঢেউয়াপাড়া তেজেন্দ্র লাল শীলের বাড়িতে রাতে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে তিনটি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে পরিবারের সবাইকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ঘরের ভেতর আটকা পড়েছিল ছয় ব্যক্তি। তারাও বিকল্প উপায়ে বের হয়ে রক্ষা করে প্রাণ।
যা বলছেন ভুক্তভোগীরা
চিকদাইর ইউনিয়নের ঢেউয়াপাড়ায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভুক্তভোগী বিমল তালুকদার বলেন, অতীতে দেখেছি জাতীয় নির্বাচন এলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বেড়ে যেত। এবার দেখছি আরও ভয়াবহতা। বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়া হচ্ছে। জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হচ্ছে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন বলে জানান তিনি।
সদর ইউনিয়নের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়ায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভুক্তভোগী সাধন বড়ুয়া বলেন, আমি বাদী হয়ে রাউজান থানায় মামলা করেছি। কাউকে চিনতে না পারায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করেছি।
কলমপতি গ্রামে বাইরে থেকে হুক লাগিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার ভুক্তভোগী শিপন দে বলেন, আমার ঘরে আগুন লাগার পর আগুনের তাপে ঘুম ভেঙে যায়। ঘর থেকে বের হতে চাইলে বাইরে থেকে হুক লাগানো থাকায় দরজা দিয়ে বের হতে পারিনি। পরে পাশের ঘরের একজনকে ফোনে ডাকার পর দরজা খুলে দিলে সবার জীবন রক্ষা পায়। তবে জীবন রক্ষা পেলেও পুরো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
রাউজান পৌরসভা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সদীপ দে সজিব বলেন, রাউজানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় চরম উদ্বেগের মধ্যে রাত কাটাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘুমন্ত সংখ্যালঘুদের হত্যার টার্গেট করা হচ্ছে। তিনি এসব ন্যক্কারজনক ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার আহ্বান জানান।
সর্বদলীয় কমিটি দরকার: ওসি
রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম বলেন, সংখ্যালঘুদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বাড়তি টিমের মাধ্যমে রাতে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটি রাতে পাহারা দেবে নিজ নিজ এলাকায়।
ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘুদের বাড়ি পরিদর্শনে ডিআইজি
রাউজান প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেছেন, রাউজানে ঘরের বাইরে দেরজা আটকে আগুন দেওয়ার যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা। একটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়। আমরা এটি হতে দেব না। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
- বিষয় :
- রাউজান
- হিন্দু
- হিন্দু সম্প্রদায়
