নদীপারে গভীর গর্ত করে বালু তোলায় বিপদে বাসিন্দারা
অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীপারের কোচপল্লি সমকাল
মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নদীর পারে গভীর গর্ত খুঁড়ে বালু তোলার কারণে মাটি ধসে বিলীন হয়েছে একটি বসতঘর। নদীতে ধসে পড়েছে বাড়ির আঙিনার ফলদ গাছপালা ও বাঁশবাগান। এখন একটিমাত্র ঘরে পরিবারের ১০ জন সদস্য নিয়ে বসবাস করছেন বৃদ্ধ আয়নাল হক। ঘরে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় পরিবারের ছয় সদস্যকে অন্যের বাড়িতে রাত্রিযাপন করতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগী আয়নাল হকের বাড়ি নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বারোমারী বাজার-সংলগ্ন চেল্লাখালী নদী তীরবর্তী বাতকুচি পুরাতন ফরেস্ট বিট এলাকায়।
আয়নাল হক বলেন, গেল বছর বালু উত্তোলনের জন্য সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের শেষদিকে বালু ব্যবসায়ীরা ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিনরাত নদীর পারে গভীর গর্ত খুঁড়ে বালু উত্তোলন করেছিলেন। এর ফলে নদীর পার ভেঙে তাঁর বাড়ির একটি বসতঘর নদীতে চলে গেছে। বাকি একটি ঘরও ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে।
এমন অবস্থা শুধু আয়নাল হকের একার না। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীপারের কয়েকটি বাড়ি ভাঙনে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেকের বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক জায়গায় নদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির
মুখে পড়েছে উপজেলার সীমান্ত সড়কের ভোগাই নদীর চারআলী সেতু। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে সেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। বেরিয়ে পড়েছে পিলারের পাইলিংয়ের রড। এ ছাড়া ঝুঁকিতে রয়েছে সীমান্ত সড়কের বুরুঙ্গা সেতু, বুরুঙ্গা শান্তির, বারোমারী বাজারের পশ্চিমপার, কোচপল্লি, উত্তর পলাশীকুড়া, বাতকুচি আটভাইপাড়া, নন্নী উত্তরবন্দ নদীপারের বাসিন্দারাও।
পরিবেশ ও নদী সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় নদীর পার ভেঙে জেলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। নদীর নাব্য ফেরাতে পরিকল্পিত খননকাজের মাধ্যমে যেমন বালু অপসারণ প্রয়োজন, তেমনই নদীর প্রকৃতি ধরে রাখতে পরিমাণ মতো বালুও প্রয়োজন। নদীতে একেবারে বালু না থাকলে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে নাব্য সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিকর ভূমিকা রাখে।
সম্প্রতি পোড়াগাঁও ইউনিয়নের ভারতের সীমান্তঘেঁষা খলচান্দা কোচপল্লিতে গেলে সেখানকার বাসিন্দারা বিরূপ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, চেল্লাখালী নদীর বিভিন্ন জায়গায় তীর ঘেঁষে অবাধে বালু তোলার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে বাড়িঘর। এ ছাড়া বালুবাহী ট্রাক চলাচলে বেহাল হয়ে পড়েছে সড়ক।
কথা হয় খলচান্দা গ্রামের রমেশ কোচ, বিরতি কোচ, মায়াদেবী কোচ ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, বিগত সময়ে বালু তোলার কারণে তীর ভেঙে নদীটি তাদের বাড়ির কাছে চলে এসেছে। বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে কোচপাড়া যাওয়ার সড়কটিও বেহাল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে পানি জমে আর শুষ্ক মৌসুমে বালুর কারণে যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে পড়ে সড়কটি।
চেল্লাখালী নদীর বুরুঙ্গা পোড়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, গত বছর এক শ্রেণির বালু ব্যবসায়ী নদীর তীরে গভীর গর্ত করে বালু উত্তোলন করেন। এ কারণে তাদের
গ্রামের পাঁচ-ছয়টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত বাংলা সনে ভোগাই নদীর বালুমহালে কালাকুমা, হাতিপাগার, নয়াবিল, ফুলপুর ও মণ্ডলিয়াপাড়া মৌজায় ৯ একর ৮২ শতাংশ ইজারা দেওয়া হয়। এ ছাড়া চেল্লাখালী নদীর দুটি অংশ ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে চেল্লাখালী বালুমহালে বাতকুচি, পলাশীকুড়া, নন্নী, তাজুরাবাদ ও সন্ন্যাসীভিটা মৌজায় ২২ একর এবং বুরুঙ্গা ও আন্ধারুপাড়া বাইগরপাড়া মৌজায় ১৯ একর ৯ শতাংশ। এই বালুমহালগুলো থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেলেও মূল নদীতে বালু না থাকায় নদীর তীর ভেঙে গভীর গর্ত করে মাটি উত্তোলন করছিলেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এতে নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের বসতবাড়ি নদীতে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এই পরিস্থিতি দেখে এ বছর নতুন করে আর কোনো ইজারা দেয়নি জেলা প্রশাসন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত বছর বালু উত্তোলনের জন্য সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু অসাধু বালু ব্যবসায়ী যত্রতত্র বালু উত্তোলন করে বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে নদীপারের বাসিন্দাদের। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলে কি হবে। আগে বালু তোলার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠবেন কী করে? নদীপারের বাসিন্দাদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে আর ইজারা না দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, এ বছর বালুমহালের ইজারা বন্ধ। তাই বালু উত্তোলনও বন্ধ রয়েছে। কেউ যেন বালু উত্তোলন না করতে পারে, তার জন্য নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। এর পরও যদি কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বালুদস্যু
- নালিতাবাড়ী
