ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফেলানী হত্যার ১৫ বছর

আজও মেলেনি বিচার, থমকে আছে আইনি লড়াই

২০২০ সালের পর ভারতের আদালতে আর শুনানি হয়নি

আজও মেলেনি বিচার, থমকে আছে আইনি লড়াই
×

নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীর কবরের সামনে বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম। সমকাল

 কুড়িগ্রাম ও নাগেশ্বরী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘সরকার গত ১৫ বছরে অনেক আশ্বাস দিছে। কিন্তু আমাগো যে ছিঁড়া কাপড় ছিল, তা ছিঁড়াই আছে। কোনো সরকার আমাগো ভালো কাপড় দিল না। দেওয়ার মধ্যে শুধু একটাই, আমার মধ্যম ছেলেটাক বিজিবির চাকরি দিছে। অথচ সরকার আমাদের যে যে প্রতিশ্রুতি দিছিল, তার অনেক কিছু পূরণ করে নাই। এখন যে সরকারেই আসুক, ফেলানী হত্যার বিচার যেন করে আর আমার পরিবারের দায়িত্বটা যেন নেয়।’ কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ২০১১ সালে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলিতে নিহত কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানী খাতুনের মা জাহানারা বেগম। 

আজ বুধবার দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা ফেলানী হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ীর উত্তর অনন্তপুর সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর নিথর দেহ স্তব্ধ করে দিয়েছিল জাতিকে। কাজের সন্ধানে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা ফেলানী সেদিন বাবার সঙ্গে ৯৪৭ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারের ৩ নম্বর সাব-পিলারের পাশ দিয়ে মই বেয়ে কাঁটাতার পেরিয়ে দেশে ফিরছিল। এ সময় টহলরত ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ তাকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর বিষয়টি নিয়ে উভয় দেশে নানা আলোচনা হলেও আজও কাঙ্ক্ষিত বিচারের আশায় ফেলানীর পরিবার। সীমান্তের কাঁটাতারে যেন আজও ফেলানীর মৃতদেহের মতোই আটকে আছে ন্যায়বিচারের আকুতি। ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ফেলানীর বাবা-মা জানেন না, মেয়ের হত্যার বিচার আদৌ হবে কিনা।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ব্যস্ততা। দিনটি ঘিরে চলছে ফেলানীর কবর ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের কাজ চলছে। সেখানেই কথা হয় তার বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারার সঙ্গে। কাঁদতে কাঁদতে তারা জানান, মেয়ে হত্যার সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি তারা। ঘুমের ঘোরেও তারা শুনতে পান কাঁটাতারে বুলেটবিদ্ধ ঝুলে থাকা ফেলানীর আর্তচিৎকার। ফেলানী হত্যার বিচার চেয়ে গত ১৫ বছরে দেশে-বিদেশে মানবাধিকার সংস্থাসহ বহুজনের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিচার পাননি তারা।

২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত হত্যাসহ নানাবিধ বিষয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এরই মধ্যে গত ৯ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীর গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটি ফেলানীর নামে নামকরণ করে। এর আগে ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে পিপলস অ্যাক্টিভিস্ট কোয়ালিশন (প্যাক) গুলশানে ভারত দূতাবাসসংলগ্ন সড়কের নাম ‘শহীদ ফেলানী সড়ক’ ঘোষণা করে সেখানে একটি নামফলকও স্থাপন করে। কিন্তু মেয়ে হত্যার ন্যায়বিচার ছাড়া এর কোনো কিছুই সান্ত্বনা দিতে পারছে না ফেলানীর বাবা-মাকে। 
ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আগের সরকারের কাছে বিচার বা কোনো সহায়তাও পাইনি। বর্তমান সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ গত বছর ঘোষণা দিয়েছিলেন আমার পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবেন। আমার মধ্যম ছেলেটাকে শুধু বিজিবিতে চাকরি দেওয়া হয়েছে। আর আমি কোনো সহায়তা পাইনি। আমার এক ছেলে কলেজে পড়ে; তার পড়ালেখার খরচ চালাতে পারি না। সে এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করে। আগামীতে যে সরকারই আসুক, আমি মেয়ের হত্যার বিচার ও সহায়তা চাই।’

জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার বিএসএফের ১৮১ সদরদপ্তরে স্থাপিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যার বিচারকাজ শুরু হয়। পরবর্তী ৫ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করেন আদালত। রায় প্রত্যাখ্যান করে ১১ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে সে দেশের সরকারকে ন্যায়বিচারের আশায় চিঠি দেন। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে তা একাধিকবার স্থগিত হয়। পরে ২০১৫ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ আরও একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করে। ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সে দেশের সরকারকে ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ লাখ রুপি দিতে অনুরোধ জানায়। কিন্তু এর জবাবে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্টো ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলামকে দায়ী করে বক্তব্য দেয়। এর পরে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য হলেও তা আজও হয়নি।

কুড়িগ্রামের সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী আতাউর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘ফেলানী হত্যা শুধু একটি সীমান্ত হত্যার ঘটনা নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বড় পরীক্ষা। ১৫ বছরেও যদি একটি শিশুহত্যার বিচার না হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি পরিকল্পিত হত্যা। আমাদের যে পেনাল কোড, সেটি ভারতেও একই। এই কোডের ৩০২ ধারায় এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ; এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। 

আরও পড়ুন

×