অসম্পূর্ণ গ্যাস লাইন-রজ্জুপথে থমকে আছে উৎপাদন
বিসিআইসির আওতাধীন ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে সোমবার পরিদর্শনে যান শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান সমকাল
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড দেশের প্রথম সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। স্বায়ত্তশাসিত এ প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশ আধুনিকায়নের কাজ শেষ হলেও গ্যাস লাইন মেরামত ও রোপওয়ের (রজ্জুপথ) কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সিমেন্ট উৎপাদনে যেতে পারছে না।
কারখানাটি আধুনিকায়ন প্রকল্প কাজের জন্য বিগত প্রায় ৫ বছর কারখানার সিমেন্ট উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এটির উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলে বিগত সরকারের আমলে। নতুন কারখানা নির্মাণে ৩ বছরের ড্রাই প্রসেস প্রকল্পটি ১০ বছর অতিক্রম করেছে। কবে প্রকল্প কাজ শেষ হবে, তা নির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে ইতোমধ্যে গ্যাস সংযোগের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে চীনা কোম্পানি মেসার্স নানাঝিং সি-হোপ সিমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড চায়নার সঙ্গে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই তারিখে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ছিল ৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ ডলার। প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির প্রায় ৯২ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অংশের রোপওয়ের ১১ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও ভারতীয় অংশের ৪ দশমিক ৫৮৮ কিলোমিটার অংশের কাজ এখনও শুরু হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন শুরু হলে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ টন ক্লিংকার ও ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন করা যাবে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৩৭ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা সুনামগঞ্জের ছাতকের সুরমা নদীতীরে ব্যক্তিমালিকানায় কয়েক শিল্পোদ্যোক্তা সিমেন্ট কারখানার নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে কারখানায় পরীক্ষামূলক সিমেন্ট উৎপাদন শুরু হয়। তখন এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৬০ হাজার টন। ১৯৪৬ সালে কারখানার সঙ্গে চুনাপাথর আহরণের খনি কেএলএমসি (কোমরা লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি) রোপওয়ে চালুর মাধ্যমে সংযুক্ত হয়।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় মালিক কারখানাটি ছেড়ে যান। যুদ্ধের পর কারখানার মালিকানা তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গ্রহণ করে এবং ইপিআইডিসির কাছে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিএল) একমাত্র সরকারি সিমেন্ট কারখানা। ব্রিটিশ আমল থেকে এখানে চুনাপাথর সরবরাহ করা (ভারতীয় চুনাপাথর খনি) কেএলএমসির ওপর ২০২০ সালে সংক্রামক ব্যাধি করোনাকালে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে সে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও ভারত সরকার সে দেশে কেএলএমসি নিবন্ধন নবায়ন না করায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে চুনাপাথর আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ভারতীয় অংশে রোপওয়ে নির্মাণকাজে চীনা প্রতিষ্ঠান একটি সংস্থাকে অনুমতি দেয়নি ভারতীয় রাজ্য সরকার। যে কারণে সেখানে রোপওয়ের কাজ সম্পন্ন হয়নি গত ৪ বছরেও। তবে এখন ওই জটিলতা কেটেছে বলে জানা গেছে।
কারখানা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ২৩০ জনকে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুর রহমান বলেন, রোপওয়ের বাংলাদেশ অংশের কাজ চলমান। ভারতীয় অংশের কাজ
দ্রুতই শুরু হবে।
গত ৯ জানুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, শিল্প সচিব, বিসিআইসির চেয়ারম্যানসহ কারখানার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ওই সময় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, কারখানাটি ওয়েট প্রসেস পদ্ধতি থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম ফের শুরু হবে বলে আশা করছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আরও লাভজনক ও টেকসই করা হবে।
- বিষয় :
- পরিদর্শক
